Advertisement

ভারপ্রাপ্তেই চলছে কুমিল্লার ৪২ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়

এশিয়া পোস্ট নিউজ, কুমিল্লা
ভারপ্রাপ্তেই চলছে কুমিল্লার ৪২ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি : এশিয়া পোস্ট

কুমিল্লার প্রায় ৪২ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। জেলার ২ হাজার ১০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৯৪টিতেই বর্তমানে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।

Advertisement

সোমবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনছুর আলী চৌধুরী।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ২ হাজার ১০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদও ২ হাজার ১০৭টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১ হাজার ২১৩ জন, ফলে শূন্য রয়েছে ৮৯৪টি পদ। অর্থাৎ জেলার প্রায় ৪২ দশমিক ৪৩ শতাংশ বিদ্যালয়েই স্থায়ী কোনো প্রধান শিক্ষক নেই।

অন্যদিকে, সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত ১৩ হাজার ৩৮৯টি পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ১২ হাজার ৪১৯ জন। ফলে এই পদেও শূন্য রয়েছে ৯৭০টি পদ। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক—উভয় পর্যায়েই এমন বিপুলসংখ্যক পদ খালি থাকায় জেলার বহু বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

শিক্ষকসংকটের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে কুমিল্লা সদর উপজেলার উত্তর রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শতবর্ষী এই বিদ্যালয়ে প্রায় এক দশক ধরে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। এই দীর্ঘ সময়ে পর্যায়ক্রমে পাঁচজন সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব সামলেছেন।

বর্তমানে বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে রয়েছেন সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল আলম। ২২৫ জন শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়টিতে মোট শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ছয়জন।

মোহাম্মদ মঞ্জুরুল আলম বলেন, ‘নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক, আর্থিক ও দাপ্তরিক সব দায়িত্ব সামলাতে হয়। দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই পাঠদানে পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। এতে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই দ্রুত স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক সহকারী শিক্ষক পদায়ন জরুরি।’

কুমিল্লার দেবিদ্বার, মুরাদনগর, নাঙ্গলকোট, চৌদ্দগ্রাম, দাউদকান্দি, বরুড়া, ব্রাহ্মণপাড়া, চান্দিনা, তিতাস, মেঘনা, মনোহরগঞ্জ, সদর দক্ষিণ, আদর্শ সদর, লাকসাম ও হোমনাসহ প্রায় প্রতিটি উপজেলাতেই শিক্ষকসংকট চরম আকার ধারণ করেছে।

বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি, কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মিয়া বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক না থাকলে সহকারী শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। প্রশাসনিক কাজ সামলাতে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে সময় দেওয়া যায় না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার মানে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে দ্রুত প্রধান শিক্ষক পদায়নের পাশাপাশি অন্তত একজন করে কেরানি (হেড ক্লার্ক) নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।

লাল-সবুজ উন্নয়ন সংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি কাওসার আলম সোহেল বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলার শত শত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি শিক্ষকসংকট কত বড় সমস্যা। প্রধান শিক্ষক না থাকলে সহকারী শিক্ষকদের বাড়তি দায়িত্ব সামলাতে হয়, যা সরাসরি শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে। শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করা উচিত।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, প্রাথমিক শিক্ষাই একজন শিক্ষার্থীর জীবনের মূল ভিত্তি। এই পর্যায়ে প্রধান শিক্ষক না থাকলে প্রশাসনিক ও একাডেমিক নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। সহকারী শিক্ষকেরা অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপে শ্রেণিকক্ষে সঠিক মনোযোগ দিতে পারেন না, যার প্রভাব শিক্ষার্থীর পরবর্তী শিক্ষাজীবনেও পড়ে। তাই এই সংকট অবিলম্বে নিরসন করা প্রয়োজন।

কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনছুর আলী চৌধুরী বলেন, ২০১৯ সালের পর থেকে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদেরই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষাকার্যক্রমে বড় ধরনের কোনো ব্যাঘাত ঘটছে বলে আমরা মনে করি না। তবে শূন্য পদ পূরণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রক্রিয়াধীন ও বিবেচনায় রয়েছে।

বিষয় :