বৈশাখের বিকেলে এনসিপির ‘ফুল না ফোটা এক বসন্ত’

শেষ পর্যন্ত সংশয় সত্যি হলো—বিভাগীয় পর্যায়ে বসন্তের ‘বড় ফুল’ ফোটাতে ব্যর্থ হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বড় চমক ছাড়া চট্টগ্রামে শেষ হয়েছে এনসিপিতে যোগদান অনুষ্ঠান, তা-ও এক বৈশাখের বিকেলে।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের জুলাই স্মৃতি হলে বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিকেলে এই যোগদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে দলটি। অনুষ্ঠানে স্থানীয় এনসিপি নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তারা চট্টগ্রামের প্রতিটি ওয়ার্ডে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
সরেজমিন দেখা যায়, অনুষ্ঠানস্থলের ধারণক্ষমতা ৩০০ এর মতো। হলের বাইরে আরও শ’খানেক লোকের উপস্থিতি ছিল। তবে দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে সাত শতাধিক নেতাকর্মী এনসিপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেছেন।
যোগদানকারী ১৭ জনের নাম ঘোষণা করা হয় মঞ্চ থেকে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চট্টগ্রাম মহানগর সেক্রেটারি জাফর আহমেদ চৌধুরী, আপ বাংলাদেশ চট্টগ্রাম মহানগর শাখার আহ্বায়ক হুজ্জাতুল্লাহ বিন ফারুক আজাদ এবং যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. এম আর রহমান মাবরুর।
‘ফুল না ফোটা এক বসন্ত’
আলোচনা ছিল এ দিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনজুর আলম এনসিপিতে যোগ দেবেন। তবে আগের দিন সন্ধ্যা থেকে তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়।
এনসিপি সূত্রে এশিয়া পোস্ট জানতে পারে, বুধবার সন্ধ্যার পরও মনজুর আলমের সঙ্গে দলের পক্ষ থেকে আলোচনা হয়। তবে তিনি কৌশলগত কারণে এনসিপিতে যোগ না দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন। দলের নেতারা চেয়েছিলেন, তিনি প্রকাশ্যে এনসিপির হাল ধরুক।
দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের কয়েকশ নেতাকর্মী এনসিপিতে যোগ দেবেন। এর মধ্যে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের থানা পর্যায়ের নেতা, গণসংহতি আন্দোলন, নাগরিক ঐক্য, চিকিৎসক, আইনজীবী এবং জুলাই অভ্যুত্থানে আহতসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই অনুষ্ঠানে এনসিপির পতাকা তলে সমবেত হবেন।
শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানে এনসিপিতে যোগ দেননি মনজুর আলম। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের অনেকে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও উল্লেখযোগ্য কাউকে দেখা যায়নি।
নেতারা যা বললেন
অনুষ্ঠানে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ যেন হয়ে উঠলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। কবিতায় সুভাষ লিখেছিলেন ‘কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে হাসছে। ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত।’
নতুন যোগ দেওয়া নেতাকর্মীদের উদ্দেশে যেন সেই বার্তা দিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আপনারা এমন এক সময়ে এনসিপিতে বসন্ত নিয়ে এসেছেন যখন সারা দেশে কালবৈশাখী চলছে। বিএনপি সরকারে এসে সংস্কারবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। ওয়াসিম এই শহরে রক্ত দিয়েছে।’
জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলফলের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও সেখানে যা ঘটেছে তা উদ্বেগের। নির্বাচনের আগে কয়েক লাখ ভোটারের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে; যাদের বড় অংশই ছিল মুসলমান এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের। সেখানে সংখ্যালঘুদের ওপর যে নির্যাতনের চিত্র আমরা দেখছি, তার একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণেই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা এখন আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। এ দেশের হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা এবং সমান অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের কাঁধে নিতে হবে।’
নতুন সদস্যদের স্বাগত জানিয়ে দলের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা ও ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘যারা আজ নতুন যোগ দিয়েছেন এবং যারা আগে থেকেই আছেন, সবাইকে ভেদাভেদ ভুলে কাজ করতে হবে। এনসিপির পতাকাতলে সবাই নিজের যোগ্যতা অনুসারে মূল্যায়ন পাবেন। মনে রাখতে হবে, আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পারস্পরিক ঐক্য।’