জামালপুরে ৬৫ দিনে ২৬ ট্রান্সফরমার চুরি

জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরি। গত ৬৫ দিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ২৬টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে। এসব ট্রান্সফরমারের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৭ লাখ টাকা। একের পর এক চুরির ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ফলে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকরা।
পল্লী বিদ্যুৎ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২ জুলাই থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৬টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই মাসে ৬টি, আগস্টে ১৭টি এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনে আরও ৩টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটে। চলতি বছরে মোট ট্রান্সফরমার চুরির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮টিতে।
ট্রান্সফরমার চুরির কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ট্রান্সফরমার প্রথমবার চুরি হলে নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনের জন্য গ্রাহকদের নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেক অর্থ পরিশোধ করতে হয়। একই ট্রান্সফরমার দ্বিতীয়বার চুরি হলে পুরো মূল্যই গ্রাহকদের বহন করতে হয়।
এই নিয়মের কারণে মাদারগঞ্জ পৌরসভার গ্রাবেরগ্রাম আশ্রয়ণ প্রকল্পের অন্তত ৪০টি পরিবার কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে। গত ২৯ আগস্ট ওই এলাকার ট্রান্সফরমার চুরি হলেও নতুন ট্রান্সফরমারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে পারেননি বাসিন্দারা। একই অবস্থা বিরাজ করছে জোড়খালী ইউনিয়নের চরগোলাবাড়ী এলাকাতেও।
মাদারগঞ্জ পৌরসভার গ্রাবেরগ্রাম আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি রবি বলেন, গত ২৯ আগস্ট প্রকল্পের ট্রান্সফরমারটি চুরি হয়। নতুন ট্রান্সফরমারের জন্য অর্ধেক টাকা দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু টাকা জোগাড় করতে না পারায় প্রকল্পের অন্তত ৪০টি পরিবার এখনো বিদ্যুৎহীন রয়েছে।
উপজেলার বালিজুড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দা লিয়াকত আলী বলেন, গত ২৫ আগস্ট তার সেচের ট্রান্সফরমারটি চুরি হয়। নতুন ট্রান্সফরমার নিতে তাকে টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় টাকা জোগাড় করতে না পারায় ফসলি জমিতে সেচ দিতে পারছি না।
মাদারগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুল হাই বলেন, প্রায়ই শুনি কোনো না কোনো এলাকার ট্রান্সফরমার চুরি হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে আমাদের অনেক কষ্ট হয়। বাচ্চাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চোরদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তি দেওয়া দরকার। না হলে মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেই থাকবে।
জানা গেছে, মূলত ট্রান্সফরমারের ভেতরে থাকা মূল্যবান তামার তার ও কয়েল ভাঙারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রির উদ্দেশ্যেই এসব চুরি সংঘটিত হচ্ছে। বর্তমানে ৫ কেভিএ ক্ষমতার ট্রান্সফরমারের দাম ৬৩ হাজার ৩৪৫ টাকা, ১০ কেভিএর দাম ৯০ হাজার ১২৫ টাকা, ১৫ কেভিএর দাম ১ লাখ ২ হাজার ৯৮০ টাকা এবং ২৫ কেভিএর দাম প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮০০ টাকা।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ চুরির ঘটনা ঘটছে লোডশেডিংয়ের সময়। ফলে বিদ্যুৎ বিভাগের অভ্যন্তরীণ কোনো চক্র চোরদের তথ্য সরবরাহ করছে কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাদারগঞ্জ জোনাল অফিসের ডিজিএম সৈয়দা ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, প্রতিটি ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
মাদারগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্নেহাশীষ রায় বলেন, চোরচক্রকে শনাক্ত করতে বিশেষ দল কাজ করছে এবং টহল জোরদার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী দীর্ঘদিনেও চোর ধরা না পড়ায় দুঃখ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, চুরি প্রতিরোধে পুলিশ, এলাকাবাসী ও বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। সেই সঙ্গে লোডশেডিং ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগকে সতর্ক থাকতে হবে। পুলিশ ও বিদ্যুৎ বিভাগ কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না।


