ঝিনাইদহে জমজমাট ফুলের বাজার, ৩ কোটি টাকা বিক্রির আশা

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে ঘিরে ফুলের সুবাসে মুখরিত হয়ে উঠেছে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা ও সদর উপজেলার গান্না বাজার। ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই বাজারে ভিড় জমাচ্ছেন ফুলচাষি, শ্রমিক ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাইকাররা। হলুদ ও কমলা গাঁদা, লাল গোলাপ, সাদা রজনীগন্ধা এবং রঙিন জারবেরায় ভরে উঠেছে বাজারের প্রতিটি কোনা। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ফুলের চাহিদা বাড়ায় ব্যস্ত সময় পার করছেন এ অঞ্চলের হাজারো ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্টদের আশা, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে এবার ঝিনাইদহের দুটি বড় পাইকারি ফুল বাজার থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে। যদিও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, পরিবহন সংকট ও বাজারের অস্থিরতার কারণে আগের বছরের তুলনায় ফুলের দাম কিছুটা কম থাকায় শঙ্কাও রয়েছে চাষিদের মধ্যে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ঝিনাইদহ জেলায় প্রায় ৪৮৯ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের ফুলের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে গাঁদা ফুলের। এ ছাড়া গোলাপ, রজনীগন্ধা, জারবেরা, গ্লাডিওলাস ও চন্দ্রমল্লিকাসহ বিভিন্ন জাতের ফুল উৎপাদন হচ্ছে। দেশের ফুলের চাহিদার একটি বড় অংশই পূরণ হয় ঝিনাইদহের ফুল দিয়ে।
কালীগঞ্জ উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা এস এম টিপু সুলতানের ফুলবাগানে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। কেউ বাগান পরিচর্যা করছেন, কেউ ফুল তুলছেন, কেউ গুচ্ছ বাঁধছেন, আবার কেউ প্যাকিং করছেন বাজারে পাঠানোর জন্য।
ফুলবাগানের কর্মচারীরা জানান, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ফুলের চাহিদা বেড়ে যায়, তাই ভোর থেকেই কাজ শুরু করতে হয়। বাগানে প্রায় ১০ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেন। তারা সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত কাজ করেন এবং প্রতিদিন ৪০০ টাকা মজুরি পান। ফুলচাষের কারণে তাদের সারা বছরই কর্মসংস্থান থাকে, যা তাদের জীবিকার প্রধান উৎস। তবে দাম কম হওয়ায় হতাশ চাষিরা।
সদর উপজেলার গান্না ফুল বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ভ্যান, সাইকেল ও মোটরসাইকেলে করে ফুল নিয়ে আসছেন চাষিরা। বাজারে পাইকারদের উপস্থিতি থাকলেও দাম আগের বছরের তুলনায় কম। বর্তমানে গাঁদা ফুলের এক ঝোপা বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়, যা আগে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ছিল। এ ছাড়া গোলাপ প্রতি পিস ২৫ থেকে ৩৫ টাকা, জারবেরা ৫ থেকে ৬ টাকা এবং রজনীগন্ধা ৭ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ফুলচাষিরা জানান, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পরিবহন সমস্যার কারণে অনেক সময় ফুল সময়মতো বাজারে পাঠানো সম্ভব হয়নি। এতে ফুলের মান ও দাম উভয়ই প্রভাবিত হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে শেষ সময়ে বিক্রি বাড়বে বলে তারা আশা করছেন।
ফুলচাষিরা আরও জানান, ঝিনাইদহের ফুলের মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এখানে আসেন। এ কারণে তারা ফুলচাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে পরিবহন সুবিধা বৃদ্ধি, বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও সরকারি সহযোগিতা বাড়ালে তারা আরও লাভবান হবেন এবং ভালো বিক্রির আশা করছেন উদ্যোক্তারা।
ফুলচাষি ও কৃষি উদ্যোক্তা এস এম টিপু সুলতান এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি অনেক বছর ধরে বিভিন্ন ফসলের পাশাপাশি ফল-ফুলচাষের সঙ্গে যুক্ত। এবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পরিবহন সমস্যার কারণে ফুলের দাম কিছুটা কম। তারপরও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ভালো বিক্রির আশা করছি। বাজার স্থিতিশীল থাকলে কৃষকরা লাভবান হবেন।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান রনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, চলতি মৌসুমে কালীগঞ্জসহ ঝিনাইদহ জেলায় প্রায় ৪৮৯ হেক্টর জমিতে ফুলের আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। আমরা আশা করছি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে কেন্দ্র করে কৃষকরা ভালো দাম পাবেন এবং ভবিষ্যতে ফুলচাষ আরও সম্প্রসারিত হবে।
প্রতি বছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে ঝিনাইদহের ফুলের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শহীদ মিনারে পৌঁছে যায় এখানকার ফুল। দাম কিছুটা কম হলেও নতুন আশায় বুক বেঁধেছেন এ অঞ্চলের ফুলচাষিরা। ফুলের রং ও সুবাসে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এই আয়োজন শুধু একটি ব্যবসা নয়, বরং এ অঞ্চলের হাজারো কৃষক পরিবারের জীবিকা ও স্বপ্নের প্রতীক হয়ে উঠেছে।