
একসময় যে মায়ের আঁচলে ছিল সন্তানদের নিরাপদ আশ্রয়, শেষ বয়সে সেই মায়েরই আশ্রয় মিলল না সন্তানের ঘরে। অসুস্থ শরীর, চলাফেরার অক্ষমতা আর বার্ধক্যের জীর্ণতায় নুয়ে পড়া জেলেকা বেগমের রাত কাটছে এখন ঘন জঙ্গলে। মাথার নিচে প্লাস্টিকের বস্তা, পরনে ময়লা কাপড়, চারপাশে মলমূত্র, পোকামাকড়ের উপদ্রব আর বন্যপ্রাণীর আতঙ্কের মাঝে মাকে এভাবে ফেলে রেখার অভিযোগ উঠেছে তারই বড় মেয়ে ময়না বেগমের বিরুদ্ধে।
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্ব শ্যামপুর গ্রামের একটি জঙ্গলের ভেতর থেকে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে ওই বৃদ্ধাকে উদ্ধার করেন স্থানীয়রা। এর আগে গত ১০ অক্টোবর রাতে তাকে মারধর করে জঙ্গলে ফেলে রাখা হয় বলে অভিযোগ।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জেলেকা বেগমের স্বামী অনেক আগেই মারা গেছেন। তার কোনো ছেলে নেই; রয়েছে তিন মেয়ে। বড় মেয়ে ময়না বেগমের বয়স ৪৮ বছর। তিনি স্বামী ও এক ছেলেমেয়েকে নিয়ে একই গ্রামে বসবাস করেন। মেজ মেয়ে মনি আক্তার (৩৫) সৌদি আরবে থাকেন। ছোট মেয়ে সীমা আক্তার (৩০) আগে সৌদি আরবে থাকলেও বর্তমানে দেশে রয়েছেন।
প্রতিবেশীদের দাবি, ছোট দুই মেয়ের বিদেশ থেকে পাঠানো টাকায় বড় মেয়ে ময়না বেগমের বাড়িতে একটি পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই বাড়িতে থেকেও বৃদ্ধা মায়ের থাকার জায়গা হয়েছিল পুরোনো ও জরাজীর্ণ একটি ঘরে। ঘরটিতে আলো ও বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন।
জেলেকা বেগম স্থানীয়দের কাছে অভিযোগ করেন, গত ১০ অক্টোবর রাতে তার বড় মেয়ে ময়না বেগম তাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর তাকে জঙ্গলে ফেলে রাখা হয়। তার দাবি, মেয়ের বাড়িতে থাকাকালে তাকে ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হতো না। গলা চেপে ধরা ও লাঠি দিয়ে পেটানোর অভিযোগও করেন তিনি।
প্রতিবেশী তোফাজ্জেল অভিযোগ করেন, জেলেকা বেগমকে নিয়মিত খাবার দেওয়া হতো না। কখনও শুধু লবণ দিয়ে ভাত দেওয়া হতো, পানিও ঠিকমতো দেওয়া হতো না। যে পাত্রে তাকে খাবার দেওয়া হতো, সেই পাত্রে কুকুর-বিড়ালও খেত বলে দাবি করেন তিনি।
মায়ের প্রতি অবহেলা ও নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ময়না বেগম। তার দাবি, মা নিজেই ঘর থেকে বের হয়ে যান এবং ঘরে থাকতে চান না। আমি তাকে মারধর করি না। তার থাকার ঘরটিও আমরা সাধ্য অনুযায়ী পরিষ্কার রাখতাম। প্রতিদিন সম্ভব না হলেও সপ্তাহে এক-দুই দিন তাকে গোসল করানো হতো।
ময়না বেগমের কিশোর ছেলে মাসুমের ভাষ্য, তাদের সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে। নিজেদের খাওয়া-দাওয়াই ঠিকমতো চলে না। এর মধ্যেও তারা নানির দেখাশোনা করেন। তার অভিযোগ, নানির অন্য দুই মেয়ে একবারের জন্যও খোঁজ নিতে আসেননি এবং কোনো খরচও দেন না।
এ বিষয়ে সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ শাওন বলেন, বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন। বৃদ্ধার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাকে সহায়তা করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

