logo

৫১ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুপেয় পানির প্রকল্পে অনিয়ম

৫১ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুপেয় পানির প্রকল্পে অনিয়ম
ছবি: এশিয়া পোস্ট

পঞ্চগড় জেলার ৫১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য গভীর নলকূপ ও সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপনে প্রায় ৫১ লাখ টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। তবে প্রকল্পের নির্ধারিত সময় শেষ হলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ে কাজ সম্পন্ন হয়নি। শুরু থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, গোপনীয়তা এবং তদারকির অভাবের অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, কোথায় কত ফুট গভীরতায় বোরিং করা হচ্ছে, কী ধরনের পাইপ ও ফিল্টার ব্যবহার করা হচ্ছে কিংবা প্রকল্পের ব্যয় কত—এসব বিষয়ে তাদের কোনো তথ্য জানানো হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে না জানিয়েই রাতের আঁধারে বোরিংয়ের পাইপ স্থাপন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি-৪) আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলার ৫১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১০০ মিলিমিটার ব্যাসের গভীর নলকূপ ও ১ দশমিক ৫ এইচপি (হর্স পাওয়ার) ক্ষমতার সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপনের কাজ ৫১ লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করছে ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান 'জমিলা খাতুন ট্রেডার্স'। অভিযোগ রয়েছে, যেখানে ১০০ ফুট বা তার বেশি গভীরতায় বোরিং করার কথা, সেখানে অনেক স্থানে ৫০ থেকে ৭০ ফুটের মধ্যেই কাজ শেষ করা হয়েছে। পাশাপাশি নিম্নমানের পাইপ ও ফিল্টার ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।

২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর শুরু হওয়া প্রকল্পটি ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এরই মধ্যে সময়সীমা অতিক্রম করেছে। অনেক বিদ্যালয়ে এখনও পাম্প স্থাপন করা হয়নি, কোথাও বা কাজ মাঝপথে থেমে রয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে কার্যাদেশ (ওয়ার্ক অর্ডার) নিয়ে। বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের দাবি, কাজ শুরুর অনেক পরে তাদের হাতে কার্যাদেশ পৌঁছেছে। ফলে প্রকল্পের শর্ত, ব্যয় এবং ব্যবহৃত উপকরণ সম্পর্কে তারা কিছুই জানতে পারেননি।

শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মতে, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে একের পর এক অভিযোগে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য সফল হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তারা প্রকল্পের কাজ ও ব্যয়ের সুষ্ঠু তদন্ত করে অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সদর উপজেলার ধাক্কামারা ইউনিয়নের ছেতনাই টেংগনমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবিউল আলম বলেন, বোরিং কত ফুট করা হচ্ছে বা কী ধরনের মালামাল ব্যবহার করা হচ্ছে, আমরা কিছুই জানি না। আমি বলেছিলাম স্কুল চলাকালে আমার উপস্থিতিতে কাজ করতে। কিন্তু তারা স্কুল ছুটির পর বিকেল ৫টার দিকে এসে তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করে চলে যায়। পুরো বিষয়টিতে লুকোচুরির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

একই ইউনিয়নের তেলিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শমসের আলী বলেন, আমার বিদ্যালয়ে একটি ডিপ টিউবওয়েল স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু কাজ শুরুর আগে কোনো লিখিত চিঠি বা প্রকল্পের বিবরণ দেওয়া হয়নি। কত ফুট পাইপ বসানো হবে কিংবা কী ধরনের ফিল্টার ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়েও আমাদের কিছু জানানো হয়নি।

এ বিষয়ে পঞ্চগড় সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোমিনুল ইসলাম বলেন, লোকমুখে জানতে পেরেছি সদর উপজেলার ২২টি বিদ্যালয়ে গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছে। অথচ শিক্ষা অফিসে এ সংক্রান্ত কোনো কার্যাদেশ বা চিঠি পাঠানো হয়নি। একটি বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখি বাজার থেকে সিলবিহীন নিম্নমানের ফিল্টার এনে বসানো হচ্ছে। শিক্ষা অফিসকে অবহিত না করার কারণে আমাদের পক্ষে কাজের মান যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না।

অভিযোগ অস্বীকার করে পঞ্চগড় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মিনহাজুর রহমান বলেন, সাবমার্সিবল পাম্পের বোরিং করতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। এ কারণে ঠিকাদার সময় বৃদ্ধির আবেদন করেছেন। আশা করছি জুন মাসের মধ্যেই কাজ শেষ হবে। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। তেঁতুলিয়ায় পাথরের স্তর থাকায় ৭০ ফুটের বেশি গভীরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে অন্যান্য এলাকায় ভালো পানির স্তর পেতে অন্তত ৯০ থেকে ১০০ ফুট গভীরতায় বোরিং করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।