logo
Advertisement

২৫ পয়সার ঋণ পরিশোধ করতে ৫৫ বছর আগের বন্ধুকে খুঁজছেন চট্টগ্রামের শিল্পপতি

আবু রায়হান তানিন
চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম
২৫ পয়সার ঋণ পরিশোধ করতে ৫৫ বছর আগের বন্ধুকে খুঁজছেন চট্টগ্রামের শিল্পপতি
পিএইচপি ফ্যামিলির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সূফী মিজানুর রহমান। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আট আনা বা ২৫ পয়সা ট্রেনের ভাড়া না থাকায় যার ঢাকায় গিয়ে চাকরির পরীক্ষা দেওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল— দীর্ঘ চার দশক পর সেই সূফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান আজ ৩৪টিরও বেশি ভারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক। তবে এই সাফল্যের নেপথ্যে থাকা এক হারানো বন্ধু এবং তার দেওয়া সেই ২৫ পয়সার ঋণ আজও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে পিএইচপি ফ্যামিলির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সূফী মিজানুর রহমানকে। তাই তো বন্ধু ও তার পরিবারকে খুঁজে বের করে ঋণ পরিশোধের আকুল বার্তা দিয়েছেন এই শিল্পপতি।

যেভাবে শুরু হয়েছিল পথচলা

১৯৬২ সালের কথা। নারায়নগঞ্জ শহরের ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. আলাউদ্দিনের ছোট ভাই আমিনের সঙ্গে সূফী মিজানুর রহমানের বন্ধু হয়। আমিনের বাড়ি ছিল যশোরে। ভাইয়ের চাকরির সুবাধে নারায়নগঞ্জে থাকতেন তারা। মিজানুর রহমান বাস করতেন নারায়ণগঞ্জেই।

সরকারি তোলারাম কলেজের সান্ধ্যকালীন বিভাগে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে) পড়াশোনা করতেন মিজানুর রহমান। পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানে সল্প বেতনে চাকরি করতেন। ভীষণ ব্যস্ততার মধ্যেও প্রতি সন্ধ্যায় পড়াশোনা শেষে বন্ধু আমিনের সাথে বসে বাড়ির কাজ (হোমওয়ার্ক) করতেন তিনি। এক দিন সন্ধ্যায় হঠাৎ আমিন একটি চাকরির খবর নিয়ে আসেন তার কাছে। জানান, ব্যাংক অব পাকিস্তান (বর্তমান সোনালী ব্যাংক)-এর মতিঝিল শাখায় নিয়োগ পরীক্ষা হবে, তুই যাবি নাকি? কিন্তু নিরাশ কণ্ঠে বন্ধুকে মিজানুর রহমান জানান, ‘দোস্ত, আমি যে ঢাকায় গিয়ে মতিঝিলে পরীক্ষা দিব, আমার তো ভাড়া নেই, টাকা নেই।’

সেসময় নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা যাওয়ার ট্রেনের ভাড়া ছিল মাত্র আট আনা বা ২৫ পয়সা। কোনো কিছু না ভেবে পকেট থেকে ২৫ পয়সা বের করে সূফি মিজানুর রহমানের হাতে তুলে দেন আমিন এবং দুজনে একসাথে রওনা হন ঢাকার উদ্দেশ্যে। ঢাকায় গিয়ে দুজনেই পরীক্ষায় অংশ নেন। ভাগ্যচক্রে মিজানুর রহমান উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি পান, কিন্তু অকৃতকার্য হন তার বন্ধু। চাকরির সুবাদে ১৯৬৫ সালে ব্যাংকে চাকরি নিয়ে চট্টগ্রাম চলে আসেন মিজানুর রহমান। এরপর সেই বন্ধুর সঙ্গে আরও যোগাযোগ হয়নি তার।

পরবর্তীতে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে এক হাজার ৪৮৩ টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন সূফি মিজানুর রহমান। প্রথমে টায়ার ও গুঁড়ো দুধের বাণিজ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে স্টিল, ফ্লোট গ্লাস, শিপব্রেকিং ও অটোমোবাইলের মতো ৩৪টিরও বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা অর্জন ও প্রতিষ্ঠা করেন। বিশাল এই শিল্প সাম্রাজ্য পরিচালনার পাশাপাশি কোনোদিন ঋণখেলাপি না হয়ে ব্যাংকিং খাতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা এবং ১১ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই তার ব্যবসায়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য। সততা, দূরদর্শিতা ও সমাজসেবায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে মর্যাদাপূর্ণ ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে।

২৫ পয়সার ঋণ

সূফী মিজানুর রহমানের বয়স এখন ৮৪। জীবনের এত অর্জনের পেছনে সেই বন্ধুকে আজও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন তিনি। চট্টগ্রাম আসা, ব্যাংকে চাকরি পাওয়া এবং জীবনের নতুন মোড় তৈরি হওয়ার পেছনে বন্ধুর সেই অবদান এখনও ভুলতে পারেনি সূফী মিজানুর রহমান। আর তাই জীবনের এই প্রান্তে এসে ৫৫ বছর আগের বন্ধুর ২৫ পয়সার ঋণ ফেরত দিতে চান তিনি।

মিজানুর রহমানের সন্তান ও পিএইচপি ফ্যামিলির ডিরেক্টর আমির হোসেন সোহেল এশিয়া পোস্টকে বলেন, ওই বন্ধুর কারণেই ব্যাংকে চাকরি নিয়ে বাবার চট্টগ্রাম আসা। এই চট্টগ্রামেই বাবার ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে। আজকের যত অর্জন তার সবকিছুর পেছনে বাবার সেই বন্ধুর একটা পরোক্ষ ভূমিকা আছে। আব্বা এজন্য তার বন্ধুকে খুঁজে বেড়ান।

হারানো বন্ধুর সন্ধানে সূফি মিজানুরের পরিবার

বন্ধু আমিনের সন্ধানে সূফী মিজানুর রহমান কয়েক বছর আগে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দিয়েছিলেন। সম্প্রতি সেই বিজ্ঞপ্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় আসে।

জানা গেছে, বন্ধুটি হয়তো আর জীবিত নেই। তবুও হাল ছাড়তে রাজি নন সূফী মিজান। সম্প্রতি আমির হোসেন সোহেল হালনাগাদ তথ্য জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, আমাদের অনুসন্ধানে মনে হচ্ছে সেই বন্ধু হয়তো আর জীবিত নেই। তবে আব্বার কড়া নির্দেশ—যাতে আমরা উনার স্ত্রী, ছেলে বা মেয়েদের অন্তত খুঁজে বের করি।