ফরিদপুরে পালকিতে চড়ে কনের বাড়িতে বর

একসময় গ্রাম-বাংলার বিয়ের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল পালকিতে বরযাত্রা। সাজানো পালকিতে চড়ে বর যেতেন কনের বাড়িতে। সঙ্গে থাকত স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস। ঢোল, বাদ্যযন্ত্র আর হাসি-আনন্দে মুখর হয়ে উঠত গ্রামের পথ। তবে কালের বিবর্তন ও আধুনিক যানবাহনের প্রসারে সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন প্রায় বিলুপ্ত।
হারিয়ে যেতে বসা সেই গ্রামীণ ঐতিহ্যকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার একটি বিয়ে। আধুনিক গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেলের পরিবর্তে পালকিতে চড়ে কনের বাড়িতে গিয়ে বিয়ে করেছেন সাব্বির ইসলাম নামের এক যুবক। তার এই ব্যতিক্রমী আয়োজন ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যেও তৈরি হয়েছে দারুণ কৌতূহল ও আনন্দের আবহ।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলার বুড়াইচ ইউনিয়নের বিলপুটিয়া গ্রামের রবিউল ইসলামের ছেলে সাব্বির ইসলাম পালকিতে চড়ে বরযাত্রী নিয়ে কনের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। বরযাত্রায় তার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনেরা অংশ নেন।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, একই এলাকার সোহরাব মোল্লার মেয়ে স্মৃতি পারভিনের সঙ্গে সাব্বির ইসলামের বিয়ের আয়োজন করা হয়। বিয়ের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং গ্রাম-বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দিতেই আধুনিক যানবাহনের বদলে পালকিতে বরযাত্রার এই সিদ্ধান্ত।
একসময় বাংলার গ্রামীণ সমাজে পালকি শুধু যাতায়াতের বাহন ছিল না; এটি ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বিশেষ করে বিয়ের অনুষ্ঠানে পালকির ব্যবহার ছিল আভিজাত্য, আনন্দ ও উৎসবের প্রতীক। বরকে পালকিতে তুলে কনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে দূর-দূরান্তের মানুষ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণদের মধ্যেও দেখা যেত সমান উৎসাহ-উদ্দীপনা।
তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই পালকি আজ স্মৃতির পাতায়। সড়ক যোগাযোগের উন্নতি ও মোটরযানের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বিয়ের বরযাত্রাতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। ফলে পালকি, পালকিবাহক ও এর সাজসজ্জার মতো ঐতিহ্যবাহী রীতিগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে।
সাব্বির ইসলামের এই আয়োজন যেন সেই পুরোনো দিনের চিত্রকেই নতুন করে ফিরিয়ে এনেছে। পালকিতে বরকে দেখে অনেক স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা পুরোনো দিনের বিয়ের গল্প ও স্মৃতিচারণ করেন। অনেকেই আবার মুঠোফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে স্মরণীয় মুহূর্তটি ধরে রাখেন।
এ বিষয়ে বর সাব্বির ইসলামের চাচা ইমরান মোল্লা বলেন, একসময় গ্রাম-বাংলার বিয়েতে পালকিতে বরযাত্রা ছিল অত্যন্ত পরিচিত ও আনন্দঘন দৃশ্য। কালের বিবর্তনে সেই ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে। ভাতিজা সাব্বির পালকিতে বরযাত্রার আয়োজন করায় আমাদেরও পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল। মনে হয়েছে, কিছু সময়ের জন্য হলেও আমরা যেন সেই সোনালি সময়ে ফিরে গিয়েছিলাম।
বর সাব্বির ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই পালকিতে বরযাত্রার গল্প শুনে এসেছি। পুরোনো দিনের বিয়েতে পালকির যে ঐতিহ্য ছিল, সেটি নিজের বিয়েতে অনুভব করার ইচ্ছা ছিল বহুদিনের। তাই আধুনিক গাড়ির পরিবর্তে পালকিতে বরযাত্রার আয়োজন করেছি। এটি আমার কাছে শুধু বিয়ের অনুষ্ঠান নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া একটি ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষুদ্র চেষ্টা।
কনের বাবা সোহরাব মোল্লা বলেন, পালকিতে বর আসায় বিয়ের অনুষ্ঠানে অন্যরকম এক আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। আশপাশের মানুষও এই পালকিতে বরযাত্রা দেখতে ভিড় করেছেন। অনেকেই বলেছেন, বহু বছর পর তারা এমন দৃশ্য দেখলেন।
বুড়াইচ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাব পান্নু বলেন, পালকিতে বরযাত্রার এই আয়োজন আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের একটি সুন্দর সেতু তৈরি করেছে। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি আমাদের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যগুলোও ধরে রাখা প্রয়োজন। সাব্বির ইসলামের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
