অনলাইন জুয়া-প্রতারণায় ৬৩ বিদেশি কারাগারে, নেপথ্যে শক্তিশালী দেশীয় চক্র

চট্টগ্রাম নগরীর অভিজাত খুলশী আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়া ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িত ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে এই চক্রের বিষয়ে সিএমপি কয়েক বছর ধরেই জানত বলে জানিয়েছে পুলিশের একাধিক সূত্র।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে লাওসের ৩৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের ৫ জন, নেপালের ১ জন এবং ভিয়েতনামের ১ জন নাগরিক রয়েছেন। তাদের কারও কাছেই পাসপোর্ট বা ভিসা পাওয়া যায়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেড় মাস আগে বাসাটি ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে চক্রটি।
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পাসপোর্ট, ভিসাসহ মূল কাগজপত্র দেশীয় চক্রের সদস্যদের হেফাজতে রয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা মূলত মাঠপর্যায়ের কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। চক্রের ‘রাঘব-বোয়াল’ ও মূল পরিকল্পনাকারীরা এখনো বাইরে রয়েছেন। তাদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। শিগ্গিরই আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হবে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের একজন এসআই নাম প্রকাশ না করার শর্তে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ২০২২ সালের দিকে এক চীনা নারী অভিযোগ করেছিলেন, তাকে রিয়াজউদ্দিন বাজারে অপহরণ করা হয়েছিল। এ ঘটনায় তিনি থানায় একটি মামলাও করেন।
ওই মামলার ছায়া তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, ওই নারী ২৫ লাখ টাকা সমমূল্যের ডলার চীনে পাঠাতে চেয়েছিলেন। তার দেওয়া ঠিকানায় ডলার দেওয়ার পর তিনি অস্বীকার করেন যে ওই ঠিকানা তিনি দেননি। এরপর যারা টাকা পাঠিয়েছিল, তারা তাকে টাকার জন্য আটকে রাখে। যেহেতু বিষয়টিতে আইনি জটিলতা ছিল, কেউ সহযোগিতা করছিল না। পরে ওই চীনা নাগরিক ও ব্যবসায়ী আদালতে সমঝোতাও করেন। পুলিশকেও মামলাটি নিয়ে আর না এগোতে বলা হয়।
ওই কর্মকর্তা বলেন, তবে ওই মামলা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ওই সময় থেকেই আমরা জানতে পারি, খুলশী এলাকায় বিদেশি নাগরিকদের পরিচালনায় একাধিক ক্যাসিনো রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই বাসা ভাড়া করতে নগদ এক কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া শুরুতে একজন তরুণ শিল্পোদ্যোক্তার মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের নামও হোটেল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন একজন প্রবাসী। তবে তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু জানাতে রাজি হননি ওই সূত্র।
গ্রেপ্তার বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে ল্যাপটপ ও মুঠোফোনসহ অন্তত ১৭০টি ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মূল হোতারা এখনো অধরা রয়েছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ১ জন শিশুসহ ৪২ জন পুরুষ ও ২০ জন নারী রয়েছেন। জাতীয়তার ভিত্তিতে শুক্রবার সন্ধ্যায় তাদের চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-২ মুহাম্মাদ আবুল মনছুরের আদালতে হাজির করা হয়। আদালত সবাইকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। খুলশী থানায় দায়ের করা সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পরে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
অভিযানের বিষয়ে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) ফয়সাল আহম্মদ প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও পুলিশের একটি যৌথ দল খুলশী এলাকার একটি বহুতল ভবনে অভিযান চালায়। চক্রটি নিরাপদ স্থান হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নিয়ে স্থানীয় সহযোগীদের সহায়তায় দেড় মাস আগে ওই ভবনের ১৪টি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়।
সেখানে একাধিক সার্ভার, কম্পিউটার ও আধুনিক প্রযুক্তির সরঞ্জাম স্থাপন করে তারা অনলাইন জুয়া, চমকপ্রদ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রতারণা এবং ভুয়া চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল। এ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংকের তথ্য হ্যাক করা হয়েছে কি না, তা উদ্ধার করা ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজারের একটি হোটেল থেকে একই ধরনের অভিযোগে ৫ জন চীনা ও ১ জন তাইওয়ানিজ নাগরিকসহ মোট ৬ জন বিদেশিকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন ও ৪০টি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়। কক্সবাজারের ওই চক্রের সঙ্গে চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার হওয়া এই গ্রুপের কোনো সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা-ও গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।


