গোপনে বিক্রি হচ্ছে সরকারি জমি, জানে না পাউবো

কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার গোমতী নদীর তীরবর্তী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জমি অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। একটি প্রভাবশালী চক্র স্ট্যাম্পের মাধ্যমে প্রতি শতক জমি প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দরে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এসব জমিতে ইতিমধ্যে শতাধিক বসতঘরসহ একাধিক বাণিজ্যিক রেস্টুরেন্ট ও দোকানপাট গড়ে উঠেছে। এদিকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে তালিকা প্রস্তুত করার কথা জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে একটি সুনির্দিষ্ট চক্র গোমতী নদীর পাড়সংলগ্ন পাউবোর জমি সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করে আসছে। ভুক্তভোগী ক্রেতাদের দাবি— তারা হাশেম রাজা, সুন্দর আলী ও জাকির নামের ব্যক্তিদের কাছ থেকে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে এই জমি কিনেছেন। নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার তাদের সঞ্চয় ও ধারদেনা করে এককালীন বা কিস্তির মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করে এখানে বসতি গড়ে তুলেছে। জমি কেনার সময় চক্রটি ক্রেতাদের আশ্বস্ত করেছিল যে, এগুলো লিজ নেওয়া বা বৈধভাবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

গোমতী নদীর তীরবর্তী কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, টিনশেড ও আধাপাকা ঘরের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি খাবারের রেস্টুরেন্ট, দোকানপাট এবং বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, গত কয়েক বছরে এসব স্থাপনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা তোফায়েল আহমেদ জানান, এখানে যারা জমি কিনেছেন, তাদের অধিকাংশই দরিদ্র মানুষ। তারা বৈধ-অবৈধ না বুঝেই দালালের খপ্পরে পড়ে জায়গা কিনেছেন। এখন উচ্ছেদের শঙ্কা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
আরিফুল ইসলাম নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, সরকারি জমি বিক্রির সঙ্গে জড়িত প্রতারকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে যারা প্রতারিত হয়ে সব হারিয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও মানবিকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জমি বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত হাশেম রাজা বলেন, জায়গাটি দখল সূত্রে আমাদের ছিল, এটা পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা তা জানতাম না। আমার বাবা স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রি করেছেন। সরকার চাইলে যেকোনো সময় নিয়ে যেতে পারে— এই শর্ত বলেই সবার কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
তবে ব্যক্তি পর্যায়ে জমি বিক্রি বা ইজারা দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অবৈধ ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাশেদ শাহারিয়ার এশিয়া পোস্টকে বলেন, জমি বিক্রির বিষয়টি জানা ছিল না। পাউবো কাউকেই কোনো জমি ইজারা দেয়নি এবং বর্তমানে ইজারা দেওয়ার কোনো সুযোগও নেই।

তিনি আরও বলেন, আমরা ইতিমধ্যে অবৈধ দখল ও স্থাপনার তালিকা প্রস্তুত করছি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুতই বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। কিছু ব্যক্তি উচ্ছেদ এড়াতে আদালত থেকে স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) নিয়েছেন, যার ফলে কিছু ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে সরকারি জমি কোনোভাবেই অবৈধ দখল বা বিক্রি করতে দেওয়া হবে না।
কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আমি সবসময় সোচ্চার। গোমতী নদীর তীরে অবৈধ দখল ও স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমাকে ডাকলে আমি অবশ্যই সহযোগিতা করব। আমিও গোমতী নদীর পাড় থেকে সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পক্ষে।
তিনি আরও বলেন, নদী রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।


