logo
সৌদিতে ছেলের মৃত্যুতে মায়ের আহাজারি

‘মা কইয়া ডাকার কেউ নেই, মোর মানিকেরে আইনে দাও’

‘মা কইয়া ডাকার কেউ নেই, মোর মানিকেরে আইনে দাও’
সংবাদ সম্মেলনে মা ছাহেরা বেগম। ছবি : এশিয়া পোস্ট

‘মা কইয়া ডাকার কেউ নেই। মোর মানিকেরে আইনে দেও মোর কোলে’—সৌদি আরবে একমাত্র সন্তান হানিফের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর এভাবেই বিলাপ করছেন মা ছাহেরা বেগম। ছোটবেলায় স্বামীকে হারিয়েছিলেন তিনি। জীবনের একমাত্র অবলম্বন ছেলেকেও হারিয়ে এখন শোকে ভেঙে পড়েছেন এই মা। অন্যদিকে, ঋণ করে বিদেশে যাওয়া হানিফের মৃত্যুর পর তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

রোববার (১১ অক্টোবর) সকালে বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে কান্নায় ভেঙে পড়ে এসব কথা বলেন সন্তানহারা মা ছাহেরা বেগম।

সন্তানের সঙ্গে শেষবারের মতো যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের সঙ্গে একটু যোগাযোগ করাইয়া দেও। তোমাগো হাত-পা ধইরা কই, যোগাযোগ করাইয়া দেও। আমার একটা সন্তান। ও ছোট থাকতে স্বামী হারাইছি। আমার কেউ নেই এই ছেলে ছাড়া। আমাকে মা কইয়া ডাকবে, এমন কেউ নেই। মোর মানিকেরে আইনে দেও মোর কোলে! ওরে হানিফা! তোর মায়রে কেউ মা কয় না, তুই কী কইয়া গেলি, আমি তোরে কেমনে ভুইলা থাকমু?’

মো. হানিফ। ছবি : পারিবারিক সূত্রে পাওয়া
মো. হানিফ। ছবি : পারিবারিক সূত্রে পাওয়া

হানিফের বয়স হয়েছিল ৩৬ বছর। তিনি একই এলাকার প্রয়াত জালাল মিয়ার ছেলে। তার ১১ বছর বয়সি ছেলে মো. জেনায়েদ ও পাঁচ বছর বয়সি মেয়ে মোসা. ছামিরা রয়েছে। পরিবারের ভাষ্য, হানিফের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন তার বাবা সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় আড়াই বছর আগে ধারদেনা করে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ করে দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান হানিফ। ভিসাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রায় দুই বছর ধরে সেখানে অবৈধভাবে একটি পাথর প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি। পরিবারের দাবি, ভিসা বৈধ করার আশায় পাঁচ মাস আগে ছয়টি এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আরও ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দালালদের দেন হানিফ। তবে শেষ পর্যন্ত তার ভিসা বৈধ হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গত ৩ অক্টোবর সৌদি আরবে হানিফের মৃত্যু হয়। ওই দিনই তার মৃত্যুর খবর পায় পরিবার। তবে কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে, তা এখনও জানতে পারেনি স্বজনেরা। বৈধ কাগজপত্র না থাকা ও আর্থিক সংকটের কারণে তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে বিপাকে পড়েছে হানিফের পরিবার। একদিকে স্বামীর মৃত্যু, অন্যদিকে ঋণের বোঝা—সব মিলিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে অসহায় অবস্থায় দিন কাটছে স্ত্রী কাজল আক্তারের।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কাজল আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামী বিদেশ যাওয়ার সময় ধারদেনা করে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। পরে ভিসা বৈধ করার আশায় ছয়টি এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আবার চার লাখ ৫০ হাজার টাকা দিই। এখন দুটি অবুঝ সন্তান নিয়ে সংসার চালানোর মতো কোনো অবস্থাই আমার নেই। উল্টো মাথার ওপর ঋণের পাহাড়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন আমার স্বামী মারা গেছে, ওরা কার মুখের দিকে তাকাবে? সরকারের কাছে আকুল আবেদন, আমার স্বামীর মরদেহটা দেশে এনে দাফনের ব্যবস্থা করে দিন, যেন আমার ছেলে-মেয়ে তাদের বাবার কবরটা দেখতে পারে। আমি সরকারের কাছে আর কিছু চাই না।’

এ বিষয়ে তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতীশ সরকার বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এ ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসন ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।