৩০০ বছরের ঐতিহ্য, মৌলভীবাজারে ‘লাল দুর্গা’ দেখতে ভিড়

শারদীয় দুর্গোৎসবে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে দেখা মিলল এক বিরল দৃশ্যের। চিরাচরিত রূপের বাইরে গিয়ে সেখানে লাল রঙের প্রতিমা গড়ে উদ্যাপিত হচ্ছে দুর্গাপূজা। লাল রঙের এই প্রতিমা দেখতে ভিড় করছেন অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী।
আয়োজকেরা জানান, পাঁচগাঁওয়ের এই পূজার বিশেষত্ব শুধু প্রতিমার লাল রঙে নয়, এর পেছনে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। সাধক সর্বানন্দ দাসের হাত ধরে শুরু হওয়া এই আয়োজন সময়ের পরিক্রমায় বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় দুর্গোৎসবে পরিণত হয়েছে।
লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, সাধক সর্বানন্দ দাস আসামের কামাখ্যায় সাধনার সময় একটি শিশুকন্যা লাভ করেন। ধীরে ধীরে শিশুটির শরীর লালবর্ণ ধারণ করতে শুরু করলে সাধক উপলব্ধি করেন, তার মধ্যে স্বয়ং দেবীর আবির্ভাব ঘটেছে। কথিত আছে, সাধকের প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী রাজনগরের পাঁচগাঁওয়ে আবির্ভাবের বর দেন এবং জানান সেখানে তার প্রতিমার রং হবে লাল। সেই বিশ্বাস ও জনশ্রুতির ওপর ভর করেই ৩০০ বছর ধরে এখানে লালবর্ণের প্রতিমায় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
পাঁচগাঁওয়ের দুর্গাপূজা ঘিরে সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত চলে বিশেষ আয়োজন। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, ধূপের সুবাস আর পূজার আনুষ্ঠানিকতায় মণ্ডপজুড়ে তৈরি হয় ভিন্ন এক আবহ। লালবর্ণের প্রতিমা দেখতে ভিড় করেন নানা বয়সি মানুষ। অনেকে আসেন মনস্কামনা নিয়ে, কেউ আসেন পরিবারের মঙ্গল কামনায়, আবার কেউ আসেন ঐতিহ্যের টানে।
পাঁচগাঁও দুর্গাপূজা উদ্যাপন কমিটির পরিচালক সঞ্জয় দাস জানান, তাদের পরিবারে ৩০০ বছরের বেশি সময় ধরে লাল রঙের প্রতিমায় দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। এটি মূলত পারিবারিক পূজা। তবে দেবীর জাগ্রত উপস্থিতি সম্পর্কে মানুষের বিশ্বাসের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় একবার পূজার আনুষ্ঠানিকতায় ছেদ পড়ে। সে বছর প্রতিমা পূজার পরিবর্তে ঘটপূজা করা হয়েছিল। পূজার দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রতিবেশীদেরও ব্যস্ত থাকতে হয়। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন সার্বিক সহযোগিতা করে।
পাঁচগাঁওয়ের ব্যতিক্রমী আয়োজনের পাশাপাশি মৌলভীবাজারের অন্যান্য পূজামণ্ডপেও চলছে শারদীয় দুর্গোৎসবের নানা আয়োজন। জেলা শহরের বেশ কয়েকটি মণ্ডপের প্রবেশপথ সাজানো হয়েছে নান্দনিক নকশায়। আলোকসজ্জা ও দৃষ্টিনন্দন সাজে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে।
মৌলভীবাজার জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সূত্রে জানা যায়, জেলায় এবার সার্বজনীন ৮৯৮টি ও ব্যক্তিগত ১২৪টিসহ মোট এক হাজার ২২টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে সদরে ১১১টি, বড়লেখায় ১৪৬টি, জুড়ীতে ৭৬টি, কুলাউড়ায় ২২৭টি, রাজনগরে ১৩৬টি, কমলগঞ্জে ১৫৪টি ও শ্রীমঙ্গলে ১৭২টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, জেলার সব পূজামণ্ডপে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে পুলিশ ও আনসারের সমন্বয়ে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে।
