ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে করায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা, গ্রামছাড়া যুবক

শরীয়তপুরের জাজিরায় ডিভোর্স হওয়া এক নারীকে বিয়ে করায় রতন সরদার (৪৫) নামের এক যুবককে সালিশে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা ও গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে।
ঘটনার পর স্থানীয় প্রভাবশালী ও সালিশকারীদের ভয়ে গত নয় দিন ধরে গ্রাম ছেড়ে বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন রতন। তিনি জাজিরা উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের মনাই ছৈয়াল কান্দি গ্রামের মৃত রাজ্জাক সরদারের ছেলে। এ ঘটনায় বিচার চেয়ে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জাজিরা থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন তিনি।
রতনের অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সালিশকারীদের মধ্যে রয়েছেন জাজিরা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলী আশরাফ মাল (৭০), সাংগঠনিক সম্পাদক মোশারফ বেপারী (৬০), বড়কান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রাজ্জাক শেখ (৮০), ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য মতিউর রহমান খান (৬০), লতিফ খান (৫৫) ও রাজ্জাক বেপারী (৬০)। এ ছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালী জাহাঙ্গীর শিকদার (৫৭), রুবেল শিকদার (৪৪), সোহেল শিকদার (৩৭) ও দিহান শিকদারসহ (২৫) আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ করেছেন রতন।
থানায় দেওয়া অভিযোগ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একই গ্রামের রুবেল শিকদারের সঙ্গে রতন সরদারের বন্ধুত্ব ছিল। পারিবারিক কলহের জেরে ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর রুবেল তার স্ত্রী রুবিনা আক্তারকে ডিভোর্স দেন। পরে চলতি বছরের ৩ আগস্ট রুবিনাকে বিয়ে করেন রতন।
রতনের অভিযোগ, তার প্রথম স্ত্রীর কোনো আপত্তি না থাকলেও দ্বিতীয় বিয়ের পর থেকেই রুবেল শিকদার ও তার লোকজন তাকে পরকীয়ার অপবাদ দিয়ে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মনাই ছৈয়াল কান্দি এলাকায় সাবেক ইউপি সদস্য মতিউর রহমান খানের বাড়ির উঠানে সালিশ বৈঠক বসে। সেখানে পাঁচ শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সালিশে রতনের বিরুদ্ধে পরকীয়াসহ কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সালিশকারীদের একজন মোশারফ বেপারী। তবে বৈঠকে তাকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং ৯ সেপ্টেম্বর সূর্য ওঠার আগেই গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন রতন।
রতনের দাবি, সালিশকারীরা ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে যান। এ ছাড়া রুবেল শিকদারের পরিবারের কাছে বন্ধক রাখা তার জমির এক লাখ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। বাকি ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা এক মাসের মধ্যে তিন কিস্তিতে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
সালিশে উপস্থিত মোশারফ বেপারী বলেন, পরকীয়ার প্রমাণসহ কোনো অপরাধ পাইনি। তারপরও বেশিরভাগ সালিশকারী রতন সরদারকে জরিমানা করেছে এবং তাকে গ্রামছাড়া করেছে। জরিমানা করার কারণ রতন সরদার রুবিনাকে বিয়ে করেছে। আমি একা প্রতিবাদ করে কী করব! আমি এটাও বলেছি, গ্রামের বিচারে সর্বোচ্চ জরিমানা হয় ৩ লাখ টাকা। বিচারে বেশিরভাগ সালিশের উদ্দেশ্য কী ছিল, আমি জানি না।
সালিশকারীদের আরেকজন রাজ্জাক বেপারী বলেন, রতন সরদারকে আমরা জিজ্ঞেস করেছি, তুমি রুবিনাকে কীভাবে বিয়ে করলা, তুমি তো আগে একটা বিয়ে করেছ। তখন রতন বলে, আমাকে ঝালমুড়ি খাইয়ে কীভাবে কী করছে আমি জানি না। তখন আমরা সালিশরা চিন্তা করলাম, তাহলে তো আর সাক্ষী লাগে না।
তিনি আরও বলেন, রতনের কারণে রুবেল শিকদারের বিয়ে ভেঙে গেছে, রুবেল জেল খেটেছেন এবং পরে ডিভোর্সের স্ত্রীকে রতন বিয়ে করেছেন। এতে রুবেল কলঙ্কিত হয়েছেন। এ কারণে সালিশে জুরি ভোটে রতনকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। পরে রতন মাফ চাওয়ায় ৫০ হাজার টাকা কমানো হয়েছে। এরপর তাকে গ্রামছাড়া করা হয়।
রতন সরদারের প্রথম স্ত্রী হোসনে আরা বেগম (৩৮) বলেন, আমার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছে, তাতে আমার সম্মতি ছিল। বিয়ে করায় আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমার স্বামীর কোনো অপরাধ নেই। তবুও জোর করে জাহাঙ্গীর শিকদার, রুবেল শিকদার, মোশারফ বেপারী, জামাল শেখ, লতিফ খানরা মিলে আমার স্বামীকে জরিমানা করেছে। আবার ঘরছাড়া করেছে। যারা আমার স্বামীর সঙ্গে জুলুম করেছে, তাদের বিচার দাবি করছি।
অভিযোগের বিষয়ে রুবেল শিকদার বলেন, আমার স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া করে আমার সংসার তছনছ করে দিয়েছে রতন সরদার। আবার আমার স্ত্রীকে বিয়ে করেছে। পরকীয়া না করলে বউ থাকতে আবার বিয়ে করল কেন? আমি আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তাই বৈঠকে সালিশরা রতনকে জরিমানা করেছে ও গ্রামছাড়া করেছে।
পরকীয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রতন সরদার বলেন, রুবিনার সঙ্গে রুবেল শিকদারের ডিভোর্স হয়েছে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে। আর আমি বিয়ে করি গত মাসে। তাহলে আমি কী অপরাধ করেছি? আমি এলাকায় সঠিকভাবে চলি। তাই আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে রুবেলের পরিবার ও স্থানীয় সালিশকারীরা আমার ওপর জুলুম করেছে। আমি এর সঠিক বিচার চাই।
এ বিষয়ে জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালেহ আহাম্মদ বলেন, এ ব্যাপারে রতন সরদার একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন। থানার এসআই হেমায়েতকে তদন্তের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণ হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

