logo

শীর্ষ মাছ উৎপাদন জেলায় অস্বাস্থ্যকর চাষাবাদ, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

শীর্ষ মাছ উৎপাদন জেলায় অস্বাস্থ্যকর চাষাবাদ, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য
অস্বাস্থ্যকর মাছ উৎপাদনে জড়িয়ে পড়ছেন খামারিরা। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ময়মনসিংহ জেলা দেশে মোট উৎপাদনের ১২ শতাংশ মাছ জোগান দেয়। এখান থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাকে শিং, মাগুর, পাঙাশ, তেলাপিয়া, পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ যাচ্ছে সারাদেশে। এই জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাছ উৎপাদন হয় ভালুকা উপজেলায়। আর এই উপজেলাতেই গড়ে ওঠা অনেক মাছের খামারে উৎপাদন বাড়াতে মুরগির বিষ্ঠা, মরা-পচা মুরগি এবং মুরগির নাড়িভুঁড়ি ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে মাছ দ্রুত বড় হলেও এর মান ও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মাছচাষে এমন ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উঠে আসায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

কিছু অসাধু খামার মালিক কম খরচে বেশি লাভের আশায় এসব অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর উপকরণ ব্যবহার করছেন। পুকুরে সরাসরি মুরগির বিষ্ঠা ফেলার ফলে পানিতে অতিরিক্ত জৈব পদার্থ জমা হচ্ছে, যা থেকে উৎপন্ন হচ্ছে ক্ষতিকর গ্যাস ও ব্যাকটেরিয়া। একইভাবে মরা-পচা মুরগি ও নাড়িভুঁড়ি পুকুরে ফেলে দেওয়ায় পানি দূষিত হয়ে পড়ছে এবং মাছের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কোটি টাকা বিনিয়োগে উৎপাদিত এসব মাছ খামার মালিকরা নিজেরা খেতে অনীহা প্রকাশ করেন, অথচ সেগুলো বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন সাধারণ মানুষের কাছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এভাবে উৎপাদিত মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং বাজারজাত করার উপযোগী হয়ে ওঠে কম সময়ে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মরা-পচা মুরগি সংগ্রহ করে গভীর রাতে খামারে এনে পানির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়াও অনেক স্থানে পুকুরের মাঝেই মুরগির খামার স্থাপন করে সরাসরি বিষ্ঠা পানিতে ফেলা হচ্ছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন আশপাশের বাসিন্দারা। খামার মালিকরা আর্থিকভাবে লাভবান হলেও ভোক্তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। এ জেলায় আধুনিক পদ্ধতিতে পলি-কালচার, মানসম্মত ফিড ব্যবহার, নিয়মিত পানির গুণাগুণ নিয়ন্ত্রণ এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে কিছু অসাধু খামারির কারণে পুরো খাতের সুনাম প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিষ্ঠা পানিতে ফেলা খামারগুলোর আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে যখন পুকুরে মরা মুরগি বা নাড়িভুঁড়ি ফেলা হয়। এতে পরিবেশ দূষণও বাড়ছে। অনেক সময় পুকুরের পানি কালচে হয়ে যায় এবং মাছ ভেসে উঠতে দেখা যায়, যা পানির মানের অবনতি নির্দেশ করে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কার্যক্রম চললেও কার্যকর কোনো নজরদারি বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে অসাধু খামারিরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন।

রাংচাপড়া এলাকার মাছ চাষি শাহাদাত হোসেন মানিক বলেন, বাজারে মাছের খাদ্যের দাম বাড়ায় কিছু খামারি বিকল্প হিসেবে এসব ব্যবহার করছেন। কিন্তু এটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর আবার খাদ্য হিসাবেও বিপজ্জনক। নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা এবং খামারিদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিরাপদ মাছচাষ নিশ্চিত করতে হবে।

ভরাডোবা এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, এ জেলায় সাধারণত আধুনিক পদ্ধতিতে পলি-কালচার, মানসম্মত ফিড ব্যবহার, নিয়মিত পানির গুণাগুণ নিয়ন্ত্রণ এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে কিছু অসাধু খামারির কারণে পুরো খাতের সুনাম প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

মাছচাষে নিরাপদ পদ্ধতি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের খাদ্য ব্যবহারে মাছের মধ্যে জীবাণু ও ক্ষতিকর উপাদান জমা হয়। মুরগির দেহে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ মাছের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌রোগ, কিডনি ও লিভারের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। মাছচাষে যে কোনো ধরনের বর্জ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। তবে মরা-পচা মুরগি বা অপরিশোধিত নাড়িভুঁড়ি সরাসরি পুকুরে ফেলা সম্পূর্ণ অনিরাপদ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মুরগির বিষ্ঠা পরীক্ষায় ক্ষতিকর প্রমাণিত হওয়ায় সরকার বহু আগেই এটি নিষিদ্ধ করেছে। তবুও কম খরচে বেশি লাভের আশায় অনেক চাষি এই পদ্ধতি অনুসরণ করছেন।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মুশফিকুর রহমান বলেন, এসব উপাদান সহজে নষ্ট হয় না এবং মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে ক্যান্সারসহ জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মাছ উৎপাদনে ময়মনসিংহ জেলায় প্রথম স্থানে আছে ভালুকা। ভালুকার ৬টি ইউনিয়নে প্রায় সাড়ে সাত হাজার মৎস্য খামার রয়েছে। এর মধ্যে নিবন্ধন রয়েছে মাত্র সাড়ে ৭০০ খামারের। ভালুকায় তিন হাজার ৫৯৬ হেক্টর আয়তনের পুকুরে ৮৩ হাজার ৫৫৩ টন মাছ উৎপাদন হয়। তবে অধিকাংশ খামারই নিয়ম-নীতির বাইরে পরিচালিত হচ্ছে।

সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুর রহমান বলেন, নিষিদ্ধ উপাদান ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা হচ্ছে। এসময় আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। তবুও কেউ কেউ মাছ চাষে নিষিদ্ধ উপাদান ব্যবহার করছে। এক্ষেত্রে খামারিদের আমরা বুঝাচ্ছি।

এ বিষয়ে ভালুকা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, অনেক খামারে মুরগির বিষ্ঠা পাওয়া গেছে। কর্মচারীরা স্বীকার করেছেন তারা নিজেরাও এসব মাছ খান না, সব মাছ বাজারে বিক্রি করা হয়। যে মাছ নিজেরা খায় না, তা মানুষকে কেন খাওয়ানো হচ্ছে- এর কোনো সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি।