সুনামগঞ্জের মিতুর ছেলে সঞ্জয়, বাংলাদেশের বিশ্বজয়

‘ঝড় উঠেছে চায়ের কাপে, গাইছে ফিফা বিশ্বকাপে, মিতুর ছেলে সঞ্জয়, বাংলাদেশের বিশ্বজয়’–কথাগুলো প্রখ্যাত প্রচ্ছদশিল্পী ও সাহিত্যিক ধ্রুব এষের। এসব পঙ্ক্তি লিখে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন সুনামগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ঈশতিয়াক শামীম।
শামীমের পোস্টে মন্তব্যে করে কবি রুবিনা ফেরদৌস লেইস লিখেন, ‘অনেক গর্বিত আমরা। আমাদের সন্তান পৌঁছে গেছে বিশ্বকাপ ফুটবল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। খুব ভালো খবর। গর্বিত মিতু, সন্তোষদা, মেশোমশাই, মাসীমাসহ পরিবারের সবার জন্য অভিনন্দন।’
এবারের ৪৮ দলের বিশ্ব ফুটবল মহাযজ্ঞে মাঠের লড়াইয়ে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা নেই। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলেন বাংলাদেশের এক গর্বিত প্রতিনিধি। বিশ্বখ্যাত তারকাদের সঙ্গে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে এবার ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনে সির সির’গানে মাতিয়ে তোলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ডিজে ও মিউজিক প্রডিউসার সঞ্জয় দেব।
সঞ্জয় দেবের জন্ম ১৯৯১ সালের ১৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। বেড়ে ওঠা ক্যালিফোর্নিয়ার সান জোসে। তিনি সেখানকার এভারগ্রিন ভ্যালি হাইস্কুল এবং ডি আনজা কলেজে পড়াশোনা করেন। সান জোসে স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবসায় ডিগ্রি নিয়ে স্নাতক হন। সঞ্জয়ের বাবা সন্তোষ দেব ও মা মিতা দেব।
সঞ্জয় দেবের মাতুলালয় (মামার বাড়ি) সুনামগঞ্জ শহরে। সুনামগঞ্জ পৌর শহরের হাছননগরের হোসেন বখত চত্বরের বাসিন্দা শহরের পরিচিতজন স্বর্গীয় ডা. ধীরেন্দ্র দেব চৌধুরীর দুই ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে চতুর্থ মিতা দেব সঞ্চয়ের মা। তিনিও সংগীতশিল্পী ছিলেন। সঞ্জয়ের দিমিমা (মিতা দেবের মা) সংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সঞ্জয়ের মাসি (মিতা দেবের বড় বোন) মুক্তা দেব সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ছাত্রী মিলনায়তন বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। প্রায় ১৫ বছর আগে সঞ্জয় দেবের সপরিবার আমেরিকায় চলে যায়। বর্তমানে পুরো পরিবার সেখানে বসবাস করছে।
সুনামগঞ্জ শহরের হাছননগরের বাসিন্দা সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট খায়রুল কবির রুমেন বললেন, খবরটি শুনে দারুণ খুশি হয়েছি। আমাদের সুনামগঞ্জের স্বনামধন্য ডাক্তার স্বর্গীয় ধীরেন্দ্র দেব চৌধুরী কাকার নাতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ডিজে ও মিউজিক প্রডিউসার সঞ্জয় দেব। তার মা মিতা দেব মিতু আমাদের কলেজ জীবনের সহপাঠী। ১৯৮২-১৯৮৪ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে আমরা একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি, একসঙ্গে মিছিল করেছি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করল সঞ্জয়। বিশ্বকাপ খেলায় না থেকেও সঞ্জয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ। মিতার সঙ্গে কথা বলেছি। মিতা বলল, সঞ্জয় লাল-সবুজের পতাকা ও রয়েল বেঙ্গল টাইগার দিয়ে ডিজাইন করে পাঁচ হাজার জ্যাকেট করেছে। শুনে ভিষণ আনন্দ লেগেছে। মনে হয়েছে, এই অনষ্ঠানে যদি উপস্থিত থেকে ‘বাংলাদেশ-বাংলাদেশ বলতে পারতাম।’
সঞ্জয় তার সঙ্গী এবং নির্বাহী প্রযোজক কুণাল আগরওয়ালের সঙ্গে কাজ করে সংগীত জীবন শুরু করেন। লস অ্যাঞ্জেলেস ভিত্তিক এই ইলেকট্রনিক মিউজিক প্রডিউসারের বেশ কিছু কাজ আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
শাংরি-লা (Shangri-La): সঞ্জয়ের সবচেয়ে পরিচিত এই মিউজিক্যাল পিসটি ইউএস টপ ৪০ এবং ডান্স রেডিওতে তালিকাভুক্ত হয়েছে। ওবভি (Obvi): ২০১৭ সালে আমেরিকান আইডল গায়ক এলিয়ট ইয়ামিনকে সঙ্গে নিয়ে এটি প্রকাশ করেন। ওয়ান ইন এ মিলিয়ন (One in a Million): ২০২১ সালে ‘ গট৭ (GOT7) এর মার্ক টুয়ানের সাথে এই গান ও মিউজিক ভিডিও প্রকাশ করেন। ম্যান অফ দ্য মুন (Man of the Moon): ২০২২ সালে ভারতীয় গায়ক গুরু রান্ধাওয়ার এই ব্লকবাস্টার অ্যালবামে পাঁচটি গান রচনা ও প্রযোজনা করেন।
এর মধ্যে ব্যাপক আলোচনায় এসেছে সঞ্জয়ের বিশ্বকাপের গান ‘সির সির’। প্রায় এক মাস আগে মরক্কোয় গানটির ভিডিওচিত্রের শুটিং শেষ হয়। গত ৮ জুন ফিফার অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে গানটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক মঞ্চে পারফর্ম করার সুযোগ পেয়ে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে সঞ্জয় লিখেন, ‘জীবন নিয়ে এমন স্বপ্ন দেখা থেকে সরাসরি সেই মঞ্চের অংশ হওয়া-পুরো বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। একজন অভিবাসীর সন্তান হিসেবে নিজের ঘরের স্টুডিও থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে পৌঁছানো সত্যি অন্যরকম এক অনুভূতি। নিজের ঘরের কোণে বসে বিট তৈরি করা থেকে আজ অফিশিয়ালি ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ এর মঞ্চে পারফর্ম করতে যাচ্ছি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের শেকড়কে রিপ্রেজেন্ট করছি। এটি কেবল আমার ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি সেই সব তরুণদের প্রতিনিধিত্ব করে যারা দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে বড় হয়েছে এবং বিশ্বাস রেখেছে যে তাদের কণ্ঠস্বরও একদিন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।’
বাংলাদেশ সময় শুক্রবার রাত একটায় কানাডার টরন্টো শহরের ‘টরন্টো স্টেডিয়ামে’ ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ স্বাগতিকদের প্রথম ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়। এই ম্যাচের ঠিক ৯০ মিনিট আগে শুরু হয় জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান; যার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে পারফর্ম করেন বাংলাদেশের সঞ্জয় দেব।
ফিফার অফিশিয়াল ঘোষণা অনুযায়ী, টরন্টোর এই উদ্বোধনী মঞ্চে পারফর্ম করেন কানাডিয়ান পপ আইকন মাইকেল বুবলে এবং অ্যালানিস মরিসেটের মতো বিশ্বখ্যাত সব বৈশ্বিক মেগাস্টাররা। তাদের সঙ্গে একই কাতারে পারফর্ম করে বিশ্বমঞ্চ মাতিয়ে তোলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই শিল্পী; যা দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মধ্যে ভিন্ন এক উন্মাদনা ও গর্বের আমেজ যোগ করেছে।
