logo

এমপির পিএর সমালোচনা করায় হাত-পা ভেঙে দেওয়ার হুমকি বিএনপি নেতার

এমপির পিএর সমালোচনা করায় হাত-পা ভেঙে দেওয়ার হুমকি বিএনপি নেতার
বক্তব্য দেন অভিযুক্ত বিএনপি নেতা সিরাজুল ইসলাম। ইনসেটেও তিনি। ছবি: সিরাজুল ইসলামের ফেসবুক আইডি থেকে নেওয়া

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে বিএনপির সংসদ সদস্য ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুকের ব্যক্তিগত সহকারী মেজবাহউদ্দিন টুটুলের সমালোচনা করায় দুই নেতাকে হাত-পা ভেঙে পঙ্গু করে দেওয়ার ও ‘হতাহত’ করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি নেতা সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযুক্ত সিরাজুল ইসলাম করিমগঞ্জ উপজেলার গুণধর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি।

শুক্রবার (২৬ অক্টোবর) বিকেল ৪টার দিকে ইউনিয়ন বিএনপির কার্যালয়ে দলীয় এক সভায় তিনি এ হুমকি দেন বলে জানা গেছে। ভিডিওতে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রুনু দরবারী ও করিমগঞ্জের সাবেক ছাত্রদল নেতা তাজুল ইসলামের নাম উল্লেখ করতে শোনা যায় তাকে।

ভিডিওতে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ওসমান ফারুকের ব্যক্তিগত সহকারী টুটুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো প্রমাণ তারা পাননি। এরপরও তার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট ও সমালোচনা করা হচ্ছে। এর জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, রুনু দরবারী ও তাজুল ইসলামকে যেখানে পাওয়া যাবে, সেখানে তারা ‘হতাহত’ করবেন এবং হাত-পা ভেঙে পঙ্গু হাসপাতালে পাঠিয়ে দেবেন। সিরাজুল ইসলামের নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

ওই সভায় সিরাজুল ইসলামের দুই পাশে বসা ছিলেন হত্যা মামলার দুই আসামি। তাদের একজন তার চাচাতো ভাই মো. আতিকুল্লাহ। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-সংক্রান্ত একটি হত্যা মামলার পলাতক আসামি। অপরজন গুণধর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সদস্য তোফায়েল আহম্মদ জাহিদ। স্ত্রী হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এই ব্যক্তি ১৩ বছর কারাভোগের পর বর্তমানে জামিনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

সিরাজুল ইসলামের বক্তব্যের পর সভায় বক্তব্য দেন তোফায়েল আহম্মদ জাহিদ। তিনি বলেন, গুণধর ইউনিয়নে সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে হবে। চেয়ারম্যান নির্বাচন, স্কুল-মাদ্রাসার সভাপতি নির্বাচন, জলমহাল, বাজার কিংবা বিভিন্ন কমিটি সব ক্ষেত্রেই তারা যাকে নির্ধারণ করবেন, তাকেই সংসদ সদস্যের কাছে দিতে হবে। এমনকি সংসদ সদস্যের কথাতেও সবকিছু হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

টুটুলের সমালোচনাকারীদের প্রসঙ্গে তোফায়েল বলেন, তাদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আওয়ামী লীগের মতো তারা নিরীহ বক্তব্য দেবেন না। কাউকে পেলে হাত-পায়ের রগ কেটে থানায় সোপর্দ করবেন বলেও হুমকি দেন তিনি। সভায় উপস্থিত ছিলেন গুণধর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. আশরাফ আলী, সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিনসহ দলটির একাংশের নেতাকর্মীরা।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যের বিষয়টি সঠিক নয় দাবি করে তোফায়েল আহম্মদ জাহিদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, এ ধরনের বক্তব্য তিনি দেননি। এটি এডিট করা হতে পারে।

হুমকির বিষয়ে তাজুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ওরা যেকোনো সময় আমাকে মেরে ফেলতে পারে। এর আগে গত ঈদের দিন ঈদের জামাতে আমাকে আক্রমণ করার জন্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ওরা ঘেরাও করেছিল। গ্রামবাসী আমাকে রক্ষা করেন।

তাজুল ইসলামের দাবি, হুমকিদাতাদের সঙ্গে তার কোনো রাজনৈতিক বিরোধ নেই। তবে গুণধর ইউনিয়নের উরদিঘী আলিম মাদ্রাসার জমি নিয়ে বিরোধের জেরে সিরাজুল ইসলাম ও তার স্বজনেরা তার ওপর ক্ষুব্ধ।

তাজুল জানান, মাদ্রাসার ৮৮ শতাংশ জমির মূল্য কয়েক কোটি টাকা। সিরাজুল ইসলাম, তার চাচা ও ভাই-ভাতিজারা জমিটি দখল করে রেখেছিলেন বলে তার অভিযোগ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মাদ্রাসার এডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আদালতের মাধ্যমে জমিটি উদ্ধার করেন তিনি। সম্প্রতি আদালতের রায়ে জমিটি মাদ্রাসার দখলে ফিরে যাওয়ায় সিরাজুল ইসলাম ও তার স্বজনেরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে দাবি করেন তাজুল।

তিনি বলেন, আমি এখন জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় আছি। এ বিষয়ে সরকার ও প্রশাসনের সহযোগিতা চাই।

গুণধর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. আশরাফ আলী এশিয়া পোস্টকে বলেন, রাজনীতিতে পক্ষ-বিপক্ষ থাকবেই। বিএনপি যেহেতু বড় দল, এখানে কোন্দলও থাকবে। কিন্তু এ জন্য অন্য বিষয় এনে কাউকে হতাহত করা হবে, হাত-পা ভেঙে পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হবে কিংবা হাত-পায়ের রগ কেটে ফেলা হবে এ ধরনের বক্তব্য আমি সমর্থন করি না।

আশরাফ আলী আরও বলেন, ওসমান ফারুকের ব্যক্তিগত সহকারীর সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে তিনিও বক্তব্য দিয়েছেন। তবে অন্য বিষয় টেনে এনে কারও বিরুদ্ধে এ ধরনের বক্তব্য দেননি।

অভিযোগের বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ওসমান ফারুকের ব্যক্তিগত সহকারী টুটুলের সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে উপজেলা ও বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রতিবাদ হচ্ছে। তাজুল ইসলাম ও রুনু দরবারীর বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ হচ্ছে।

সিরাজুল ইসলামের ভাষ্য, তাজুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওসমান ফারুক ও তার ব্যক্তিগত সহকারী টুটুলের বিরুদ্ধে পোস্ট ও লেখালেখি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে তাদের কার্যালয়ে একটি বৈঠক হয়। সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা একেকজন একেক ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন, তিনিও বক্তব্য দিয়েছেন। তবে শুধু তার নামই সামনে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি। ভিডিওতে তার বক্তব্য রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সিরাজুল ইসলাম বলেন, তিনি কী বলেছেন, তা ভিডিওতেই পাওয়া যাবে।

এ দিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর গত আট মাসে নিজের নির্বাচনি এলাকা কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ ও তাড়াইলে খুব কম সময় দিয়েছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক। এসময়ে জাতীয় সংসদের তিনটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হলেও তিনি একদিনও বক্তব্য দেননি। এর মধ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।

তার অনুপস্থিতিতে ব্যক্তিগত সহকারী মেজবাহউদ্দিন টুটুলের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয় বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দুই উপজেলায় সার ডিলার নিয়োগ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এডহক কমিটির সভাপতি নিয়োগকে কেন্দ্র করে টুটুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনা চলছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেজবাহউদ্দিন টুটুলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তা রিসিভ হয়নি। এ ছাড়াও হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলেও কোনো উত্তর মেলেনি।