logo

রাধা-কৃষ্ণের প্রেম ও ভক্তির অনন্য উপাখ্যান মণিপুরি মহারাসোৎসব

রাধা-কৃষ্ণের প্রেম ও ভক্তির অনন্য উপাখ্যান মণিপুরি মহারাসোৎসব
ছবি: এশিয়া পোস্ট

​কার্তিকের শিউলিঝরা ভোরে হিমেল হাওয়ার পরশ আর আকাশে শরৎ-হেমন্তের সোনালি আলোর মিতালি, সব মিলিয়ে প্রকৃতি তখন এক স্নিগ্ধ রূপ নেয়। ঠিক এই সময়েই কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার পবিত্র প্রেমের চিরন্তন উপাখ্যান এবং অলৌকিক রাসলীলানুকরণকে কেন্দ্র করে মেতে ওঠে দেশের অন্যতম বর্ণাঢ্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী মণিপুরি সম্প্রদায়।

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুরের শিববাজার (জোড়ামণ্ডপ) এবং আদমপুরের তেতইগাঁওয়ে যুগ যুগ ধরে উদযাপিত হয়ে আসছে এই মহারাস উৎসব। এটি কেবল মণিপুরি সম্প্রদায়েরই নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক সংস্কৃতির মানচিত্রে অন্যতম বৃহৎ ও আকর্ষণীয় এক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হতে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী মহারাস উৎসব।

​​মণিপুরি মহারাস উৎসব মূলত দুটি প্রধান পর্বে বিভক্ত, দিনের বেলা উদযাপিত হয় ‘রাখালরাস’ এবং রাতের গভীরে নিবেদিত হয় মূল আকর্ষণ ‘মহারাস’। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় রাখালরাসের প্রস্তুতি। বাল্যকালে রাখালরূপে বৃন্দাবনে কৃষ্ণ ও বলরামের গরু চরানোর নানান কীর্তি এবং লীলাখেলা এর মূল বিষয়বস্তু। রাখালরাসের শুরুতে বালক কৃষ্ণ, বলরাম ও সখাদের গোচারণে বনে যাওয়ার অনুমতি দিতে গিয়ে মায়েদের অশ্রুমাখা বিলাপ অত্যন্ত নিপুণভাবে গীত-মুদ্রায় রূপায়িত হয়। এরপর একে একে উপস্থাপিত হয় বকাসুরসহ নানান অসুর বধের কাহিনি। নৃত্য, বাদ্য ও বিশেষ মুদ্রার ছন্দে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলে এই শৈল্পিক পরিবেশনা।

রাখাল বালকদের পরনে থাকে নানান রঙের বাহারি ধুতি, গায়ে নান্দনিক অঙ্গহার, মাথায় ময়ূরপুচ্ছে তৈরি রাজকীয় চূড়া এবং হাতে বাঁশি। রাখালরাসের মণ্ডলী বা মঞ্চ সাধারণত মাঠের মাঝখানে ভূমিসমতলে স্থাপন করা হয়, যার চারপাশ ঘিরে থাকে বৃত্তাকার কলাগাছের বেষ্টনী। এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে মণ্ডপের চারপাশে বসে বিশাল মেলা। দেশের নানা প্রান্ত থেকে সওদাগরের দল আগের দিন থেকেই এসে পসরা সাজিয়ে বসেন। মেলায় মণিপুরি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, হস্তশিল্প, প্রাচীন ও আধুনিক বইপুস্তক থেকে শুরু করে নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যায়। গোধূলিবেলায় কৃষ্ণ তাঁর গোপসখাদের নিয়ে গরুর পায়ের খুরে রাঙা আলোয় ধূলি ওড়াতে ওড়াতে ঘরে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে প্রতীকীভাবে সমাপ্তি ঘটে রাখাল রাসের।

রাখালরাস শেষ হলেও মেলার কোলাহল থামে না। লোকজনের কেনাকাটা, আত্মীয়-স্বজনদের সাক্ষাৎ, গল্পগুজব ও ঐতিহ্যবাহী খাওয়াদাওয়া চলতে থাকে সমান তালে। এরপর উন্মুক্ত মঞ্চে শুরু হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রাসের তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য নিয়ে বিশিষ্টজনদের আলোচনা ছাড়াও আধুনিক গান, নৃত্য ও নাট্য পরিবেশনা দর্শকদের মাতিয়ে রাখে।

​

​রাত ১১টা থেকে ১২টার ঠিক মধ্যবর্তী সময়ে উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও পবিত্রতম পর্ব ‘মহারাস’ শুরু হয়। মাধবপুরের শিববাজারের ঐতিহাসিক জোড়ামণ্ডপে (পাশাপাশি তিনটি মণ্ডপ) এবং অন্যদিকে তেতইগাঁওয়ে সানা ঠাকুরের মণ্ডপে (বর্তমানে সেখানেও দুটি ভিন্ন মঞ্চ) শুরু হয় এই মহোৎসব।

​মণিপুরি নাট্য নির্দেশক ও গবেষক শুভাশিস সিনহা এশিয়া পোস্টকে বলেন, মণিপুরি সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব এই মহারাস। সময়ের পরিক্রমায় মণিপুরি মহারাস উৎসব আজ কেবল একটি সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি রূপ নিয়েছে অসাম্প্রদায়িক এক মিলনমেলায়। পরম আরাধ্য এক সত্তার সঙ্গে মানুষে প্রেমাকুল আত্মার মিলনকে গীত-নৃত্য-বাদ্য-মুদ্রাসহযোগে প্রকাশ করার এক পরিবেশনাশিল্প রাস। শ্রীমদ্ভাগবত, চৈতন্যদর্শন কিংবা বৈষ্ণবীয় সহজিয়া ধারার দর্শনের সীমা ছাড়িয়ে তা মণিপুরি জনপদের নিজস্ব শিল্পপ্রকাশরীতির সঙ্গে মিলেমিশে নতুন এক অবয়ব নিয়েছে। আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে যাপিত জীবনের বেদনা ও অনুভূতি যেখানে স্পন্দিত হয়ে ওঠে।

​তিনি আরও বলেন, রাসলীলার নানা রূপ রয়েছে, যেমন নিত্যরাস, কুঞ্জরাস, বসন্তরাস, মহারাস, বেনিরাস বা দিবারাস। তবে শারদীয় পূর্ণিমা তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় বলে মহারাসকে মণিপুরিরা সস্নেহে ‘পূর্ণিমারাস’ বলে থাকেন।

​মহারাস উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এর দৃষ্টিনন্দন পোশাক এবং প্রাচীন বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার। রাসের বিশেষ পোশাক ও অঙ্গহারগুলোর মধ্যে রয়েছে ​পশোয়াল, লেইত্রেং, কতনাম, খাংচেৎ, ​মেইখুম্বি, কুমিন এবং খবাকয়েং। ​এছাড়া নৃত্যের সময় গোপীরা তাঁদের গলায় পরিধান করেন মণিপুরি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী খাঁটি সোনার হার, যা তাদের রূপকে আরও ফুটিয়ে তোলে।

​বাদ্যযন্ত্রের ক্ষেত্রেও রয়েছে বৈচিত্র্য। মণিপুরের মূল ধারায় মৃদঙ্গ ও মন্দিরার পাশাপাশি বীণা, পাখোয়াজ, পেনা, বেহালা ইত্যাদি ব্যবহৃত হলেও, বাংলাদেশের মণিপুরি সমাজে সাধারণত মৃদঙ্গ, মন্দিরা, শেলপুং, বাঁশি, হারমোনিয়াম, মইবং বা শঙ্খ, মাংকাং ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের সুরের মূর্ছনা তোলা হয়।

রাস উৎসবের ​মণ্ডপসজ্জার কাজটিও অত্যন্ত নিখুঁত ও শৈল্পিক। মণ্ডপের মাঝখানে বৃত্তাকারে ভূমিসমতলে কুঞ্জ বা মণ্ডলী স্থাপন করা হয়। নিপুণহাতে মাটিতে আঁকা হয় নানান বৈচিত্র্যময় আলপনা। এর কেন্দ্রে একটি পবিত্র পট এঁকে তার মধ্যে কলসি, ধান, দূর্বা, নারকেল, কলা, খই, নাড়ু, ফুল এবং কীর্তনের গামছাসহ ঘট প্রস্তুত করা হয়। সেই কেন্দ্র থেকে দুই কিংবা আড়াই ফুট ব্যাসার্ধ নিয়ে একটি গোলাকার মণ্ডলী তৈরি করা হয়, যা বাঁশের খুঁটি ও ছোট বেড় দিয়ে ঘেরা থাকে। এই বেড়ার চতুর্দিক আকর্ষণীয় কাগজের আলপনা দিয়ে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে সাজানো

​মণিপুরি মহারাসলীলা সেবা সংঘের সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ কুমার সিংহ উৎসবের প্রস্তুতি সম্পর্কে এশিয়া পোস্টকে বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও কমলগঞ্জের মাধবপুর শীববাজার জোড়া মণ্ডপে মহারাস উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। এ বছর মাধবপুরে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে ১৮৪তম মহারাস উৎসব বৃহৎ পরিসরে উদযাপিত হতে যাচ্ছে। আমাদের সব প্রস্তুতি চলছে।

​অন্যদিকে, রাস পূর্ণিমা উৎসব উদযাপন কমিটি আদমপুরের সাধারণ সম্পাদক সমরেন্দ্র কুমার সিংহ আশাবাদ ব্যক্ত করে এশিয়া পোস্টকে বলেন, এ বছর আদমপুরে ৪১তম রাস পূর্ণিমা উৎসব উদযাপিত হবে। আমরা অত্যন্ত আশাবাদী, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সরব উপস্থিতিতে এই উৎসব প্রাঙ্গণ এক সুমহান মিলনমেলায় পরিণত হবে।

প্রসঙ্গত, ​প্রতিবছর কার্তিক পূর্ণিমার এই একটি দিনে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মাধবপুর ও আদমপুর যেন এক টুকরো বৃন্দাবনে পরিণত হয়। হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক, গবেষক, এবং সব ধর্মের মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে মণ্ডপ প্রাঙ্গণ। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আদি সংস্কৃতি, মনোহর নৃত্যশৈলী এবং রাধা-কৃষ্ণের ভক্তির এক স্বর্গীয় আবহ তৈরি করে এই মহারাস উৎসব। যুগের পর যুগ ধরে এভাবেই মণিপুরি সম্প্রদায় তাদের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে দেশবাসীর সামনে গৌরবান্বিত করে চলেছে।