বিষবৃক্ষের তলে শৈশব, তামাকের আগুনে পুড়ছে শিশুদের স্বপ্ন

প্রখর রোদের দুপুরে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার হাজরাহাটী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ এখন নীরব। যেখানে শিশুদের কোলাহলে মুখর থাকার কথা ছিল, সেখানে পড়ে আছে ফাঁকা ক্লাসরুম আর নিস্তব্ধ খেলার মাঠ। আশপাশের গ্রামগুলোতে খোঁজ মিলছে না স্কুলপড়ুয়া শিশুদের। তারা এখন ব্যস্ত তামাক আড়ত ও শুকনো চুল্লির পাশে শ্রমে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুষ্টিয়ায় তামাক চাষ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি মৌসুমে আগের বছরের তুলনায় আরও ৪৫৪ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ যুক্ত হয়েছে, মোট চাষের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৩৮৫ হেক্টর।
স্থানীয়রা জানান, কুষ্টিয়ার মিরপুর, ভেড়ামারা ও দৌলতপুরে তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণের মৌসুম এখন পুরোদমে চলছে। আর এরই ভেতরে ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী শত শত শিশু যুক্ত হচ্ছে শ্রমে,যা ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ।
হাজরাহাটী গ্রামে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মো. স্বাধীন শেখ এখন তামাক শ্রমিক। প্রতিদিন ৬০০ টাকা ও দুপুরের খাবারের বিনিময়ে সে তামাক পাতার গ্রেডিংয়ের কাজ করে।
স্বাধীন জানায়, স্কুলে যাইতে মন চায়, কিন্তু কাম না করলে ঘরে খাবার জোটে না। সারাদিন তামাকের গন্ধে শরীর খারাপ লাগে, তাও করতে হয়।
একই গ্রামের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র মাহিন জানায়, চুলার পাশে দাঁড়াইলে দম আটকে আসে, চোখ জ্বলে। পড়ালেখা সব ভুলে যাই।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক চাপেই তারা শিশুদের কাজে যুক্ত করতে বাধ্য হচ্ছেন। একজন বাবা বলেন, অন্য ফসলে লাভ নাই। তামাক কোম্পানি আগাম টাকা দেয়, তাই এদিকে ঝুঁকতে হয়। কামলা নিলে খরচ বাড়ে, তাই ছেলেদেরই কাজে লাগাই।
আরেকজন অভিভাবক জানান, সরকার নিষেধ করে, কিন্তু পেটের দায় তো মানে না। কোম্পানি বরং বেশি পাতা দিলে বোনাস দেয়।
কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. হোসেন ইমাম বলেন, শিশুদের শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যানসার, লিভার সিরোসিসসহ মারাত্মক রোগের ঝুঁকি রয়েছে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় সংকট।
কুষ্টিয়া জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল লতিফ শেখ বলেন, শিশুদের সরাসরি পুনর্বাসনের কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচি এখন তাদের হাতে নেই। তারা কেবল সচেতনতা বাড়াতে উঠান বৈঠক করছেন।
এদিকে, শিশুশ্রমের অভিযোগের বিষয়ে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটিবি) স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।