logo
প্রেমের টানে বাংলাদেশে এসে করুণ পরিণতি

রংপুর মেডিকেলের মর্গে ৫ বছর ধরে পড়ে আছে ভারতীয় নাগরিকের মরদেহ

খন্দকার রাকিবুল ইসলাম
রংপুর
রংপুর মেডিকেলের মর্গে ৫ বছর ধরে পড়ে আছে ভারতীয় নাগরিকের মরদেহ
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নিমচা মৈত্রী স্ট্রিটের বাসিন্দা প্রবীর মন্ডল। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (রমেক) হিমঘরের ট্রলিতে দীর্ঘ ৫ বছর ধরে পড়ে আছে ভারতীয় নাগরিক প্রবীর মন্ডলের মরদেহ। আইনি জটিলতা ও ভারতীয় দূতাবাসের দায়িত্বহীনতার কারণে মরদেহটি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর কিংবা দাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। হিমঘরের বিল পরিশোধের ব্যবস্থা না করায় লাশটি হিমঘরের ট্রলিতে রাখায় ইতিমধ্যেই পচন ধরে কঙ্কালসদৃশ হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশ জানায়, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ফেসবুকের মাধ্যমে বাংলাদেশের ময়মনসিংহের এক নারীর সঙ্গে পরিচয় হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নিমচা মৈত্রী স্ট্রিটের বাসিন্দা প্রবীর মন্ডলের। ২ মাস পর নভেম্বর মাসে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী দিয়ে দহগ্রামে আসেন তিনি। সেখানে এক আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থানকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয়রা তাকে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তের জন্য তার মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ২০২১ সালের ১০ নভেম্বর একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। তারপর থেকে দীর্ঘ ৫ বছর ধরে প্রবীর মন্ডলের মরদেহ হিমঘরে পড়ে আছে।

হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৪ ডিসেম্বর লালমনিরহাট জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে পুলিশ সদর দফতরে পাঠানো এক চিঠিতে বিজিবির মাধ্যমে বিএসএফের সঙ্গে পতাকা বৈঠক করে মরদেহ ভারতে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু প্রায় ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি। হিমঘরের দায়িত্বে থাকা এক ডোম নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বৈদ্যুতিক বিপর্যয়সহ নানা কারণে মরদেহে পচন ধরতে শুরু করেছে। এখন অবস্থা এমন যে মরদেহটি পুরোপুরি বিকৃত হয়ে গেছে। অপরদিকে পুলিশ বলছে, হিমঘরের ভাড়া পরিশোধের ব্যবস্থা না থাকায় লাশটি রাখা হয়েছে হিমঘরের ট্রলিতে। ইতিমধ্যে লাশটি কঙ্কালসদৃশ হয়ে গেছে।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুলাল বসুনিয়া বলেন, মরদেহটি এখনো হিমঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। ইতিমধ্যে লাশে পচন ধরেছে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পেলেই ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় নাগরিক প্রবীর মন্ডলের লাশ হস্তান্তরের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পত্র প্রেরণ করা হয়। এরপরও কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় পুনরায় চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের উপসচিব স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠি প্রেরণ করা হয়। তবে পুলিশ অধিদপ্তর থেকে লাশ হস্তান্তরের বিষয়ে পত্রের প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই দফা চিঠি দেওয়ার পরও সুফল পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, ভারতীয় দূতাবাসের দায়িত্বহীনতার কারণেই লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে ২০২১ সালে ভারতীয় এক নাগরিক বাংলাদেশে এসে পাটগ্রামের বুড়িমারীতে তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে ওঠেন। সেখানে অসুস্থতার পর হাসপাতালে ভর্তি করলে তিনি মারা যান। মারা যাওয়ার পর একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা হলে লাশ ময়নাতদন্তের পর পাটগ্রামে হিমঘর না থাকায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। আইনি জটিলতার কারণে ২০২১ সাল থেকেই লাশটা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। লাশটা এখন হিমাগারে নেই, কারণ হিমাগারে প্রতিনিয়ত বিল ওঠে। হিমাগারের পাশে ট্রলিতে রাখা হয়েছে। হিমাগারে না রাখার কারণে লাশটা কঙ্কালসদৃশ হয়ে যাচ্ছে। লাশটা বর্তমানে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। প্রতি মাসে আমরা থানা থেকে গিয়ে একবার লাশটা দেখে আসি। আমরা চাই এটা দ্রুত নিষ্পত্তি হোক।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, ভারতের নাগরিক প্রবীর মন্ডলের মরদেহ ২০২১ সাল থেকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছে। পুলিশের তত্ত্বাবধানে আমাদের এখানে রাখা আছে। যেহেতু লাশটা ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি, তাই গত ২১ তারিখে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে লাশ হস্তান্তরের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে। সরকার ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে লাশ হস্তান্তরের চেষ্টা করছে। এ কাজ দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার পরেই আমরা লাশটা হস্তান্তর করতে পারব।

সু শাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যাপক ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, রংপুর মেডিকেলের মর্গের ফ্রিজিং সিস্টেম খুবই দুর্বল। এটি স্টিলের বক্স ছাড়া কিছুই নয়। এখানে লাশটা থাকতে থাকতে কঙ্কাল অবস্থায় চলে গেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রবীর মন্ডলের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর লাশটা তারা নিতে অস্বীকৃতি জানালে আমাদের দেশের নিয়ম অনুযায়ী সৎকার করা উচিত ছিল। দীর্ঘদিন লাশটা মর্গে পড়ে থাকার কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে দেশেই লাশটা সৎকারের ব্যবস্থা করা উচিত।

রংপুর জেলা জজ আদালতের আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ বলেন, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মৃতদেহকে যথাযথ সম্মান করা উচিত। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ৫ বছর ধরে ভারতীয় নাগরিকের লাশ পড়ে থাকার পরও কী কারণে তা হস্তান্তর করা হয়নি, সেটা আমরা জানি না। আন্তর্জাতিক আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে মৃতদেহ সংরক্ষণ করা ও নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কথা। আমরা মনে করি এতে আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে এবং এই মৃতদেহের প্রতি চূড়ান্ত রকমের অবমাননা ও অবজ্ঞা করা হয়েছে। অনতিবিলম্বে সরকারের উচিত মৃতদেহ তার নিজ দেশে বা পরিবারের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা। যদি তার পরিবার এটি গ্রহণ করতে বা সৎকার করতে সামর্থ্যহীন হয়, তবে সরকারকেই দায়িত্ব নিয়ে আমাদের দেশে মৃতদেহের সৎকারের ব্যবস্থা করা উচিত।