
দেশে লবণের সম্ভাব্য ঘাটতি ও বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সরকার দেড় লাখ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে আমদানিতে উচ্চ শুল্ক, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামালের মান ও পরিবহন ব্যয়ে বৈষম্য এবং গ্যাস-সুবিধার অভাবে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে খুলনার লবণশিল্প। ফলে একের পর এক মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি চালু থাকা মিলগুলোও টিকে থাকার সংকটে রয়েছে।
পদ্মা সল্ট ক্রাশিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের শ্রমিক হায়দার আলী বলেন, একসময় খুলনায় ২৯টি লবণ মিল ছিল, এখন আছে মাত্র ৯টি। এর মধ্যে অধিকাংশ মিলেরই অবস্থা খারাপ। মালিকদের পুঁজি শেষ হয়ে গেছে। তাদের কারখানায় ঘণ্টায় ২০ টন উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বাজারে বিক্রি নেই। এক দিন ছয় ঘণ্টা চালানোর পর এক সপ্তাহ কারখানা বন্ধ রাখতে হয়।
হায়দার আলী বলেন, তারা মূলত কুতুবদিয়ার লবণ পান। এতে গ্লেজ কম থাকায় ভালোভাবে ধুয়ে ও পরিশোধন করে সাদা করতে হয়। অন্যদিকে মহেশখালীর বোল্ডার লবণ তুলনামূলক সাদা ও গ্লেজযুক্ত হওয়ায় কম প্রক্রিয়াজাত করেই ব্যবহার করা যায়। এর ওপর খুলনায় গ্যাস না থাকায় উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নতুন বাজার, রূপসার শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজের মালিক নুরুল হুদা বলেন, বর্তমানে প্যাকেটজাত ভ্যাকুয়াম সল্টের বাজারে দেশি পণ্যের বিক্রি অনেক কমে গেছে। একসময় মাসে প্রায় দেড় লাখ কার্টন বিক্রি করতেন, এখন সেখানে প্রায় ৩ হাজার কার্টন বিক্রি হচ্ছে। বাজারে সাদা ও ঝরঝরে ভ্যাকুয়াম সল্টের চাহিদা বেশি হওয়ায় ক্রেতারা সেদিকেই বেশি ঝুঁকছেন। ফলে দেশি প্যাকেটজাত লবণের বিক্রি কমে গেছে। পাইকারি বাজারে চাহিদা কম থাকায় তাদের ব্যবসায়ও এর প্রভাব পড়ছে।
রমনা সল্ট রিফাইনারি প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, বর্তমানে আমদানি করা লবণের ক্ষেত্রে খরচ অনেক বেশি পড়ছে। সরকার শুল্ক নির্ধারণে যে মূল্য বিবেচনা করছে, তার কারণে আমদানিকারকদের প্রকৃত ক্রয়মূল্যের তুলনায় বেশি মূল্যের ওপর শুল্ক দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে আমদানি শুল্ক ও অন্যান্য খরচ যোগ হয়ে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। পাশাপাশি গত কয়েক বছরে জাহাজভাড়াও বেড়েছে।
মোহাম্মদ সেলিম বলেন, দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ লবণ মজুত আছে, তা পরবর্তী মৌসুম পর্যন্ত নাও যেতে পারে। এতে মৌসুম শুরুর এক মাস আগে বাজারে সংকট তৈরি হয়ে দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে। এ আশঙ্কা থেকেই সরকার দেড় লাখ টন লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে। এতে বাজারের ঝুঁকি কমবে। তবে আমদানির শুল্ক কমানো হলে এ উদ্যোগ আরও কার্যকর হবে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে।

মোহাম্মদ সেলিম আরও বলেন, খুলনায় গ্যাস-সুবিধা না থাকায় লবণ উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেছে। চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের মিলগুলো গ্যাস-সুবিধা পাওয়ায় তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন করতে পারছে। ফলে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে খুলনার অনেক লবণ মিল বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার কার্যকর নীতি গ্রহণ না করলে অবশিষ্ট কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধুমতি সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক ওমর খালেদ বলেন, সরকার যে দেড় লাখ টন লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এতে বাজারে সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলা করা সহজ হবে। বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ লবণ মজুত আছে, তা মৌসুম পর্যন্ত নাও যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে মৌসুম শুরুর আগেই বাজারে সংকট তৈরি হয়ে দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার ঘাটতি পূরণে আমদানির অনুমতি দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। তবে আমদানির শুল্ক কমানো হলে এ উদ্যোগ আরও কার্যকর হবে।
তিতাস সল্টের কর্মকর্তা রঞ্জন হালদার বলেন, খুলনায় উৎপাদিত লবণ বাজারে কম চলার অন্যতম কারণ উৎপাদন খরচ বেশি। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মিলগুলো যে মানের কাঁচা লবণ পায়, খুলনার মিলগুলো তা পায় না। কুতুবদিয়া থেকে আসা কাঁচা লবণে ঘাটতি থাকায় ভালো মানের লবণ তৈরি করতে কয়েক ধাপে পরিশোধন করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে।
রঞ্জন হালদার বলেন, খুলনার মিলগুলোতে কাঁচামাল পরিবহনেও বাড়তি খরচ হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলের মিলগুলো তুলনামূলক কম পরিবহন খরচে কাঁচামাল পেলেও খুলনার মিলগুলোকে বেশি খরচ বহন করতে হয়। একই সঙ্গে কাঁচামালের ওজন ও মানের ক্ষেত্রেও তারা সুবিধা পায় না। ফলে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের মিলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে খুলনার মিলগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
রঞ্জন হালদার আরও বলেন, কুতুবদিয়ায় টিউবওয়েলের নোনা পানি ব্যবহার করে দ্রুত লবণ উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে উৎপাদন মৌসুমও আগের তুলনায় এগিয়ে এসেছে। তবে ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, খুলনায় লবণশিল্পের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৩ সালে। ভৈরব ও রূপসা নদীর তীরে একসময় ২৮টি লবণ মিল গড়ে ওঠে। ১৯৯৮ সাল থেকে বিভিন্ন কারণে এ শিল্পের বহু মিল বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে নয়টি লবণ কারখানা চালু রয়েছে বলে বিসিক জানিয়েছে। মিল মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্যা, লোকসান, পুঁজি সংকট, ব্যাংকঋণ পেতে জটিলতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় এবং বড় মিলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারায় এ সংকট তৈরি হয়েছে।
বিসিক খুলনা জেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) গোলাম সাকলাইন বলেন, সরকার লবণ আমদানির যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে খুলনার লবণশিল্প লাভবান হবে। কারণ এখানে মূলত লবণের কাঁচামাল আমদানি করা হবে। ফলে খুলনার লবণশিল্পে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই।
তিনি বলেন, খুলনায় কোনো লবণচাষি নেই। বর্তমানে জেলায় নয়টি লবণ কারখানা চালু রয়েছে। এসব কারখানার মালিকেরা ভবিষ্যতে আরও লবণ আমদানি করতে আগ্রহী। ফলে আমদানির মাধ্যমে কাঁচামালের সংকট ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
