ঋণের টাকায় আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ

দূর থেকে একটি ভ্যানগাড়ি এগিয়ে আসতে দেখা যায়। তাৎক্ষণিক ভ্যানগাড়ির পাশে জড়ো হয় লোকজন। প্রথম দেখায় সেটিকে সাধারণ কোনো ভ্যান মনে হওয়ার সুযোগ নেই।
পুরো ভ্যানজুড়ে আকাশি-সাদা রঙের ছোঁয়া; সামনে-পেছনে আর্জেন্টিনার পতাকার নকশা। চালকের গায়েও আর্জেন্টিনার জার্সি।
কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি শুধু একটি ভ্যান নয়; কোনো এক ভক্তের আবেগ, ভালোবাসা ও উন্মাদনার বহিঃপ্রকাশ।
ভ্যানটির চালক সুমন গৌড়। তবে এলাকায় এই নামে খুব কম মানুষই তাকে চেনেন। সবার কাছে তিনি ‘সুমন মেসি’।
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পৌর শহরের দত্তপাড়া গ্রামের সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরে বসবাস করেন ৩৫ বছর বয়সি এই ভ্যানচালক। জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ভ্যানগাড়ি। প্রতিদিনের আয়ে চলে সংসার। ফুটবল বিশ্বকাপ কিংবা আর্জেন্টিনাকে ঘিরে কোনো বড় আয়োজন সামনে এলেই যেন তার জীবনের অগ্রাধিকার বদলে যায়।
সম্প্রতি ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন সুমন। পরিবারের প্রয়োজন কিংবা ব্যবসার কাজে নয়, সেই অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় করেছেন প্রিয় দল আর্জেন্টিনার সমর্থনে। ভ্যানগাড়িকে সাজিয়েছেন আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে। কিনেছেন নতুন জার্সি। জার্সির সঙ্গে মিলিয়ে পরছেন লুঙ্গিও। গ্রামের বিভিন্ন স্থানে টানিয়েছেন বড় আকারের ১৬টি আর্জেন্টিনার পতাকা।
সুমনের কাছে বিষয়টি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং ভালোবাসার প্রকাশ। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই আর্জেন্টিনার খেলা দেখি। মেসির খেলা সবচেয়ে ভালোলাগে। আর্জেন্টিনা আমার কাছে শুধু দল নয়, একটা আবেগ।
এই ভ্যানচালক বলেন, ভালোবাসার জায়গা থেকে নিজের ভ্যানগাড়িটি আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে সাজিয়েছি। আমার এলাকায় বড় পতাকাও টানিয়েছি। ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ তুলে এসব করেছি। ভক্ত দেখলেই চা-পান খাওয়াই। এই আনন্দের দাম টাকায় মাপা যায় না। আমি আমার পছন্দের দলের জন্য করি।
তিনি আর্জেন্টিনার পতাকায় মোড়ানো তার ভ্যানগাড়ির দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন, দলকে ভালোবাসি। তাই করছি।
সুমনের এই আনন্দের গল্পের উল্টো পিঠে রয়েছে পরিবারের দীর্ঘশ্বাস। স্ত্রী আরতি গৌড় জানান, সংসারের বাস্তবতা ও স্বামীর আবেগের মধ্যে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয় তাকে। সংসার চলে খুব কষ্টে। কিস্তির চাপ আছে। অভাবের কারণে ছেলেকে মেয়ের বাড়িতে রাখতে হয়েছে। কিন্তু খেলা আসলে তার স্বামী কিছুই বোঝেন না। পতাকা, জার্সি, আয়োজন–এসব নিয়েই পড়ে থাকেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছেও সুমন এক পরিচিত চরিত্র। আর্জেন্টিনা জিতলে উৎসব করেন, কখনও রান্না করে মানুষকে খাওয়ান, কখনও সমর্থকদের নিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করেন। তার ফুটবলপ্রেম নিয়ে এলাকায় যেমন হাস্যরস আছে, তেমনি আছে বিস্ময়ও।
আবদুল্লাহ আল নোমান স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসা খারাপ না। কিন্তু ঋণ করে এসব করা ঠিক না। আমরা অনেকবার বুঝিয়েছি। তবু সে বলে, এটা তার ভালোবাসার জায়গা।
আজিজুল ইসলাম নামের আরেকজন বলেন, বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে পতাকা উৎসব নতুন কিছু নয়। শহর থেকে গ্রাম- সবখানেই প্রিয় দলকে নিয়ে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস দেখা যায়। তবে সুমনের গল্প সেই উন্মাদনাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। কারণ এখানে ফুটবলপ্রেম শুধু সমর্থনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি মিশে গেছে একজন নিম্নআয়ের মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয়, স্বপ্ন এবং আত্মতৃপ্তির সঙ্গে।
তিনি বলেন, আমরা দত্তপাড়ার মানুষ যখন তাকে ‘সুমন মেসি’ বলে ডাকি, তখন আমরা শুধু একজন আর্জেন্টিনা সমর্থককে নয়, বরং এমন একজন মানুষকেই দেখি, যিনি কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও নিজের আবেগকে বাঁচিয়ে রাখতে চান।
