Advertisement

সুন্দরবনের বিলাসবহুল দুই লঞ্চ নিলামে বিক্রি, হারিয়ে গেল শতবর্ষের ঐতিহ্য

এশিয়া পোস্ট নিউজ, বাগেরহাট
সুন্দরবনের বিলাসবহুল দুই লঞ্চ নিলামে বিক্রি, হারিয়ে গেল শতবর্ষের ঐতিহ্য
এমএল বনরানী। ছবি : এশিয়া পোস্ট

সুন্দরবনের শতবর্ষের রূপসী ও ঐতিহ্যের সাক্ষী ঐতিহাসিক দুই জলযান ‘এমএল বনরানী’ ও ‘এমএল বনকন্যা’ অবশেষে নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অচল ও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকা লঞ্চ দুটির প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও সেগুলো সংরক্ষণ না করে নিলাম করায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

Advertisement

তাদের মতে, লঞ্চ দুটিকে উন্মুক্ত জাদুঘর বা পর্যটনকেন্দ্রে সংরক্ষণ করা গেলে সুন্দরবনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা যেত।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে বৃহত্তর সুন্দরবনে বন কর্মকর্তাদের যাতায়াত ও নিবিড় পরিদর্শনের সুবিধার্থে কলকাতার খিদিরপুর ডকইয়ার্ডে নির্মাণ করা হয়েছিল এই দুটি বিলাসবহুল লঞ্চ। ১৯০২ সালে তৎকালীন ৩৮ হাজার টাকা ব্যয়ে ‘এমএল বনকন্যা’ এবং ১৯০৮ সালে ৫২ হাজার ৯৪৭ টাকা ব্যয়ে ‘এমএল বনরানী’ নির্মিত হয়। বার্মিজ সেগুন কাঠের দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য ও রাজকীয় নির্মাণশৈলীর কারণে লঞ্চ দুটি সে সময় প্রমোদতরী হিসেবে বেশ সমাদৃত ছিল।

স্টিম ইঞ্জিনচালিত ‘বনরানী’র ইঞ্জিন ক্ষমতা ছিল ৩৫৪ অশ্বশক্তি। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে স্টিম ইঞ্জিনের পরিবর্তে দুটি লঞ্চেই বসানো হয় ডিজেল ইঞ্জিন। এরপর ২০০৪ সালে পুরোনো ইঞ্জিন পরিবর্তন করে আধুনিক দাইও ইঞ্জিন স্থাপন করা হয়েছিল।

সুন্দরবনের লোনা জল ও জোয়ার-ভাটার সঙ্গে দীর্ঘদিন সংগ্রাম করা এই দুই ঐতিহাসিক জলযানে চড়ে বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য, ব্রিটেনের রানি, প্রিন্স, আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ বিশ্বের অসংখ্য রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন।

১৯৯৩ সালে সুন্দরবন বিভাগকে ‘পূর্ব’ ও ‘পশ্চিম’—দুই বিভাগে ভাগ করা হলে ‘বনরানী’ পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগ এবং ‘বনকন্যা’ পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের অধীনে চলে যায়। এর মধ্যে ‘বনরানী’কে সর্বশেষ ২০১৬ সালে চালানো হয়েছিল। এরপর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে দুটি লঞ্চই ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে খুলনার চানমারী ও ফরেস্ট ঘাট এলাকায় পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয় এগুলো।

একপর্যায়ে ঐতিহাসিক লঞ্চ দুটিকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সুন্দরবন বিভাগ খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছে সংস্কারের সম্ভাব্য ব্যয় জানতে চাইলে তারা জানায়, প্রতিটি লঞ্চ সংস্কারে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা করে মোট ৭ কোটি টাকা প্রয়োজন। ২০১৮ সালে খুলনা শিপইয়ার্ডের সেই প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ বা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর লঞ্চ দুটি নিলামে বিক্রির পথ বেছে নেয় বন বিভাগ। চলতি বছরের মার্চে উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে ‘এমএল বনরানী’ ২৬ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ টাকা এবং ‘এমএল বনকন্যা’ ২০ লাখ ২৭ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। নিলামগ্রহীতারা সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করলেও এখনো লঞ্চ দুটি বন বিভাগের কাছ থেকে বুঝে নেননি।

বাগেরহাট পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় অচল ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়া শতবর্ষী লঞ্চ দুটি গত মার্চে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। নিলামগ্রহীতারা অর্থ পরিশোধ করলেও এখনো সেগুলো বুঝে নেননি।

তিনি আরও যোগ করেন, মূল লঞ্চ দুটির আদলে রেপ্লিকা তৈরি করা গেলে নতুন প্রজন্ম সুন্দরবনের এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে।

এ বিষয়ে বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) ইমরান আহমেদ বলেন, বনরানী ও বনকন্যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। লঞ্চ দুটির স্মৃতি ধরে রাখতে রেপ্লিকা তৈরির একটি পরিকল্পনা রয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলেই সেই কাজ শুরু করা হবে।

তবে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী এই দুই স্মারক জলযান সংরক্ষণ না করে বিক্রি করে দেওয়ায় সুন্দরবনের ইতিহাসের একটি অমূল্য অধ্যায় হারিয়ে গেল বলে আফসোস করছেন স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও সচেতন মহল। তাদের দাবি, নিলাম না করে অন্তত লঞ্চ দুটির মূল কাঠামো পর্যটনকেন্দ্রে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল।

বিষয় :