logo
Advertisement

খেলার মাঠ এখন বর্জ্যের ভাগাড়, বিপাকে বিদ্যালয়ের শিশুরা

কামরুজ্জামান মিন্টু
মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ
খেলার মাঠ এখন বর্জ্যের ভাগাড়, বিপাকে বিদ্যালয়ের শিশুরা
মুক্তাগাছার বাঁশাটি চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে জমে থাকা দূষিত পানি ও কাদা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

স্কুলের ফটক পেরোলেই নাকে লাগে তীব্র দুর্গন্ধ। মাঠের এক পাশে জমে আছে কালচে পানি, ওপর ভেসে উঠছে ময়লা-আবর্জনা। কোথাও কাদা, কোথাও মুরগির বিষ্ঠার স্তূপ। সেই পথ দিয়েই প্রতিদিন বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ে ঢোকে শিশুরা—কেউ নাক চেপে ধরে, কেউ বা দ্রুত পা বাড়ায়। সকালের সমাবেশে জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময়ও এই দুর্গন্ধ থেকে রেহাই মেলে না।

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার ৪০ নম্বর বাঁশাটি চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠের এই বাস্তবতা শিশুদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনকে ব্যাহত করছে। বিদ্যালয় মাঠের নিচু অংশে দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকার পাশাপাশি আশপাশের গরু ও মুরগির খামারের বর্জ্য মিশে চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা অতিষ্ঠ। মাঠের একটি অংশ শিশুদের খেলাধুলা তো দূরের কথা, স্বাভাবিকভাবে চলাচলেরও অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ শিশুদের কাছে আনন্দের জায়গা হওয়ার কথা। ক্লাসের ফাঁকে ছোটাছুটি, দল বেঁধে খেলাধুলা, শরীরচর্চা কিংবা বিভিন্ন জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা এই মাঠের। কিন্তু বাঁশাটি চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সেই মাঠই এখন দুর্গন্ধ ও অস্বস্তির উৎস।

মাঠ ঘুরে দেখা যায়, নিচু একটি অংশে দীর্ঘদিনের জমাট পানি কাদায় পরিণত হয়েছে। পানির সঙ্গে মিশে আছে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। কোথাও পানির রং ঘোলাটে, কোথাও বা একদম কালচে। বাতাসের সঙ্গে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধ। মাঠের ওই অংশে শিশুদের খেলাধুলা এখন পুরোপুরি বন্ধ বললেই চলে।

স্থানীয়রা জানান, বর্ষাকালে সমস্যাটি আরও প্রকট হয়। বৃষ্টির পানি জমার পাশাপাশি খামারের বর্জ্য এসে সেখানে মেশে। পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘ সময় তা আটকে থাকে। ফলে একদিকে তৈরি হয় জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে বর্জ্য মিশে পানি দূষিত হয়ে পড়ে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে কোমলমতি শিশুরা। প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার সময় দুর্গন্ধযুক্ত এই পানির পাশ দিয়েই তাদের যেতে হয়। মাঠের বড় একটি অংশ ব্যবহার করতে না পারায় খেলাধুলার সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছে।

স্থানীয় মধ্যবয়সী বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, খামারগুলোর বর্জ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ বা অপসারণের ব্যবস্থা না থাকায় তা বৃষ্টির পানি ও অন্যান্য প্রবাহের সঙ্গে বিদ্যালয়ের মাঠের দিকে চলে আসে। মাঠের নিচু অংশে পানি আটকে থাকায় বর্জ্য জমতে থাকে। একসময় সেই পানি দুর্গন্ধযুক্ত ও নোংরা রূপ নেয়। ছোট শিশুদের কেউ কেউ অসাবধানতাবশত ওই নোংরা পানিতে পড়ে যেতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

অভিভাবকদের উদ্বেগ শুধু দুর্গন্ধে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় সেখানে মশার বংশবিস্তার এবং জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে তাই চিন্তিত অভিভাবকেরা।

অভিভাবক সাথী আক্তার ও জহুরা বেগম জানান, সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো হয় নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠার জন্য। কিন্তু স্কুলের মাঠের এমন অবস্থা দেখে তাঁরা দুঃচিন্তায় থাকেন। নোংরা পানি ও বর্জ্যের কারণে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে বলে তাঁদের ভয়।

তারা আরও জানান, কোনো খামারের বর্জ্য যদি বিদ্যালয়ের মাঠে এসে জমে, তবে তা আর নির্দিষ্ট কোনো পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা থাকে না। এতে পুরো এলাকার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদ্যালয়ের মতো সংবেদনশীল জায়গার পাশে বর্জ্য জমা আরও বেশি উদ্বেগের।

তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই সমস্যার সঙ্গে কেবল খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই জড়িত নয়। মাঠের ওই অংশ নিচু হওয়ায় পানি জমে থাকার পুরোনো সমস্যাও রয়েছে। পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় বর্জ্য জমার একটি স্থায়ী জায়গা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—দুটি মিলে সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

আমিনুল ইসলাম নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, আমরা চাই উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শুধু মাঠ ভরাট কিংবা খামার সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশেই যেন পদক্ষেপ সীমাবদ্ধ না থাকে। পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা করা, বিদ্যালয় সীমানায় বর্জ্য প্রবেশ বন্ধ করা এবং আশপাশের খামারগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খায়রুল আলম বলেন, বিদ্যালয়ের পাশেই ফিরোজ নামের এক ব্যক্তি গরু ও মুরগির খামার করেছেন। খামার থেকে বের হওয়া মুরগির বিষ্ঠা ও অন্যান্য বর্জ্য বিদ্যালয়ের সীমানা দিয়ে মাঠে এসে পড়ে এবং জমে থাকা পানির সঙ্গে মিশে যায়।

তিনি আরও জানান, বর্জ্যের দুর্গন্ধের কারণে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, অফিসকক্ষে দাপ্তরিক কাজ করা এবং সকালের সমাবেশ পরিচলনা করতেও কষ্ট হয়। বিষয়টি সমাধানের জন্য ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সংগঠক লে. কর্নেল (অব.) শাহাব উদ্দিন বলেন, যে মাঠে শিশুদের দৌড়াদৌড়ি করার কথা, সেখানে তারা এখন নাক চেপে হাঁটে। যে প্রাঙ্গণে সকালের সমাবেশে নির্মল বাতাসে জাতীয় সংগীত গাওয়ার কথা, সেখানে দুর্গন্ধ শিশুদের মনোযোগ কেড়ে নেয়। যে বিদ্যালয় শিশুদের পরিচ্ছন্নতা ও সুস্থতার শিক্ষা দেয়, তার পাশেই যদি মুরগির বিষ্ঠা ও দূষিত পানি জমে থাকে, তবে সেটি কেবল একটি মাঠের দুরবস্থা নয়—আমরা শিশুদের জন্য কেমন পরিবেশ তৈরি করছি, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে ধরে।

বাঁশাটি চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠটি দ্রুত পরিষ্কারের অপেক্ষায় থাকলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি বর্জ্য প্রবেশের পথ বন্ধ করা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। অন্যথায়, আজকের দুর্গন্ধ সাময়িক দূর হলেও আগামী বর্ষায় সেই নোংরা পানি, বর্জ্য ও শিশুদের নাক চেপে স্কুলে ঢোকার দৃশ্য আবারও ফিরে আসবে।

এ বিষয়ে মুক্তাগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কৃষ্ণচন্দ্র সমাধানমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মাঠের যে অংশে পানি জমে থাকে, সেখানে মাটি ভরাট করে ফুলের বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মুরগির খামারের মালিকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে এবং খামারটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।