logo

কাগজে ২৫৮, শ্রেণিকক্ষে ৩ শিক্ষার্থী: এভাবেই চলছে এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা

জাহিদ খন্দকার
গাইবান্ধা
কাগজে ২৫৮, শ্রেণিকক্ষে ৩ শিক্ষার্থী: এভাবেই চলছে এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা
শ্যামপুর নাসির উদ্দিন প্রধান দাখিল মাদ্রাসায় শ্রেণিকক্ষে মাত্র তিন শিক্ষার্থী। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী ২৫৮ জন। শিক্ষক-কর্মচারী ১২ জন। অথচ গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার মুক্তিনগর ইউনিয়নের শ্যামপুর নাসির উদ্দিন প্রধান দাখিল মাদ্রাসায় গিয়ে শ্রেণিকক্ষে মিলল মাত্র তিন শিক্ষার্থী। তাদেরও সবাই নিজ নিজ শ্রেণির নয়—দশম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে ক্লাস করছিল সপ্তম শ্রেণির একজন। গত তিন মাসে বিভিন্ন সময় মাদ্রাসাটিতে গিয়ে একজন শিক্ষার্থীকেও পাওয়া যায়নি।

‎

সরেজমিনে দেখা গেছে, একটি কক্ষ ছাড়া প্রায় সব শ্রেণিকক্ষই ফাঁকা। বেঞ্চ পড়ে আছে এলোমেলো, ল্যাবরুমে ঝুলছে তালা। কোথাও শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষেই বিশ্রাম নিতে দেখা গেছে। এদিকে হাজিরা খাতায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখানো হলেও বাস্তবে তাদের অনেকেরই মাদ্রাসায় আসার তথ্য মিলছে না। এতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও হাজিরা খাতার তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে।

শ্যামপুর নাসির উদ্দিন প্রধান দাখিল মাদ্রাসাটি ২০১৯ সালে এমপিওভুক্ত হয়। মাদ্রাসাটির কোড নং ১৯৮৭৬ এবং EIIN নং ১২১৫৯৮। বর্তমানে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন মোট ১২ জন। এর মধ্যে শিক্ষক আটজন ও অন্যান্য কর্মচারী চারজন।

‎

‎তবে মাদ্রাসাটির হাজিরা খাতা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, যে দিনগুলোতে শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষার্থীকেও পাওয়া যায়নি সেই দিনগুলোসহ বাকি দিনগুলোও হাজিরা খাতায় অনেক শিক্ষার্থীকে নিয়মিত উপস্থিত বা ‘প্রেজেন্ট’ দেখানো হয়েছে। খাতায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি থাকলেও স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে তাদের অনেকেরই নিয়মিত মাদ্রাসায় আসার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে হাজিরা খাতায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখানো এবং বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে তাদের উপস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে।

‎

madrasa5

‎মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ২৬০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রথম শ্রেণিতে ১১, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১৯, তৃতীয় শ্রেণিতে ১২, চতুর্থ শ্রেণিতে ২৩, পঞ্চম শ্রেণিতে ৩৩, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৩৬, সপ্তম শ্রেণিতে ৩১, অষ্টম শ্রেণিতে ৩০, নবম শ্রেণিতে ২৫ এবং দশম শ্রেণিতে ৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।

এছাড়া ২০২৬ সালের দাখিল (এসএসসি) পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে ২৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে মাত্র আটজন পাস করেছে বলে প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে।

‎

‎মাদ্রাসার সাবেক ভারপ্রাপ্ত সুপার ফুলআরা বেগম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের মধ্যে দুটি গ্রুপ রয়েছে। গ্রুপিংয়ের কারণে প্রতিষ্ঠানে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। এখানে শিক্ষকও কম। শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়ে বই নিয়ে চলে যায়, নিয়মিত ক্লাসে আসে না।

‎স্থানীয় বাসিন্দা হারুন বলেন, মাদ্রাসায় এত সংখ্যক শিক্ষার্থী থাকার কথা থাকলেও শ্রেণিকক্ষগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

১০ শ্রেণির ছাত্র মো. মোজাহিদ বলে, আমরা ক্লাস করি না। কারণ গণিত, আরবি ও ইংরেজী শিক্ষক নেই । ক্লাস না করে আমরা প্রাইভেট পড়ে সিলেবাস কমপ্লিট করি।

একই শ্রেণির আরেক ছাত্র মো. শওন ব্যাপরী বলে, মাঝে মাঝে ক্লাসে আসি। ভালো ভালো সাবজেক্টের স্যার নেই ক্লাসে এসে কি হবে। তাই আমরা ক্লাস করি না।

৭ম শ্রেণির ছাত্র মো. রহুল বলে, আমাদের ইংরেজি ও অংকের স্যার না থাকার কারণে আমরা ক্লাসে আসি না। আজ আমি ১০ শ্রেণির মাঝে ক্লাস করছি। কি আর করা সব বিষয়ের স্যার নেই, তাই এক রুমেই ক্লাস করতে হচ্ছে।

৮ম শ্রেণির এক ছাত্রের অভিভাবক নুরুল ইসলাম বলে, এই মাদরাসাটিতে লেখাপড়ার মান ভালো না। বাংলা ও ইরেজির শিক্ষক নেই তাই ছাত্ররা আসে না।

madrasa8

১০ শ্রেণির এক ছাত্রের অভিভাবক আব্দুল মতিন বলেন, আমার ছেলেকে এই মাদরাসায় ভর্তি করে দিয়ে ভুল করেছি। এই মাদরাসায় ৮ জন শিক্ষক ৪ জন কর্মচারী তবে মাদরাসাটি ইংরেজি ও অংকের শিক্ষক নেই এজন্য ছাত্র-ছাত্রী ক্লাসে যায় না।

‎আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মান্নান বলেন, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে আসছে কি না এবং শিক্ষকরা যথাযথভাবে পাঠদান করছেন কি না। এসব বিষয় কর্তৃপক্ষের তদারকি করা প্রয়োজন। মাদ্রাসাটির প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

‎

‎স্থানীয়দের অনেকের অভিযোগ, শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠানে এলেও নিয়মিত পাঠদান হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়ে বই নিয়ে চলে যায়, কিন্তু ক্লাসে আসে না। বছরের পর বছর এভাবে প্রতিষ্ঠানটি চললেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। কাগজে-কলমে ২৬০ শিক্ষার্থী থাকলেও শ্রেণিকক্ষে যদি একজন শিক্ষার্থীও উপস্থিত না থাকে, অথচ হাজিরা খাতায় অনেক শিক্ষার্থীকে উপস্থিত দেখানো হয়।

‎বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সুপার সহকারী মাওলানা মো. হামিদুর রহমান বলেন, এখানে ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষক নেই। মাদ্রাসা সুপারও নেই। তিনজন সহকারী মাওলানার মধ্যে বর্তমানে আমি একাই আছি। অধিকাংশ শিক্ষক না থাকায় প্রতিষ্ঠানের এমন হযবরল অবস্থা হয়েছে। প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন হয়। কিন্তু ক্লাস করার মতো শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেই।

‎

‎মাদ্রাসাটির সাবেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক ফজলুল হক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মাদ্রাসাটিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম। নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত না হলে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

এই বিষয়ে মুক্তিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আহসান হাবীব লায়ন বলেন, মাদরাসাটির প্রতিষ্টাকালীন সুপার ও সভাপতি এমপিও ভুক্তের পরে শিক্ষক নিয়োগের বিরোধের কারণে শিক্ষার্থী আসে না বলে জানা গেছে। আমি চেষ্টা করতে বিষয়টি নিয়ে কথা বলে মাদ্রাসাটির সুন্দর পরিবেশ ফিরে আনার।

সাঘাটা উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার আমিরুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, কোনো শিক্ষার্থী উপস্থিত না থাকলেও যদি হাজিরা খাতায় তাকে প্রেজেন্ট করে রাখা হয়, তাহলে এটি চরম অপরাধ। বর্তমানে ইউএনও স্যার নেই। তিনি দায়িত্বে আসার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

‎

‎জেলা শিক্ষা অফিসার আতাউর রহমান বলেন, আমি বিষয়টি অবগত আছি। সরেজমিনে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে নাসির উদ্দিন প্রধান দাখিল মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির দায়িত্বরত সভাপতি ও সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বর্তমান দায়িত্বে থাকা ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মাদ্রাসার বিষয়টি খোঁজ খবর নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।