ঋণের বোঝা শোধ আর হলো না, আগুনে ছাই প্রবাসীদের স্বপ্ন

প্রবাসের মাটিতে কঠোর পরিশ্রমে ঋণের বোঝা শোধ করা, নতুন করে সংসার সাজানো কিংবা সন্তানের রঙিন ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন ছিল তাদের। সেই লক্ষ্যেই দিনরাত কাজ করে যাচ্ছিলেন সৌদি আরব প্রবাসী একঝাঁক বাংলাদেশি। কিন্তু এক অগ্নিকাণ্ড নিমেষেই সেই সব স্বপ্ন ছাই করে দিয়েছে।
সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় আগুনে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন নওগাঁর ১৩ প্রবাসী। প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের পরিবারে এখন শুধুই মাতম আর কফিনের করুণ অপেক্ষা।
রোববার দুপুরে রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকার একটি সোফা তৈরি কারখানায় এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই মোট ১৬ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ১৩ জনেরই বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়।
নিহতরা হলেন—আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালী গ্রামের দুই ভাই মোহন প্রামাণিক (২২) ও সুমন প্রামাণিক (১৬), একই গ্রামের রুবেল প্রামাণিক (৩০) ও কলিমুল্লাহ প্রামাণিক (৩৫)। এ ছাড়া নিহত হয়েছেন সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল (৩৪) ও আব্দুল জলিল (৪৮), উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০) এবং নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার শাহিন (৩৮)।
ঘটনার পর থেকে নওগাঁর গন্ডগোহালী, উজানপৈ, ডুবাইসহ সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলোতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। গন্ডগোহালী গ্রামের দুই সন্তান মোহন ও সুমনকে হারিয়ে মা ময়না খাতুনের বিলাপ থামছেই না। সাত বছর আগে বড় ছেলে এবং দুই বছর আগে মেজো ছেলে বিদেশে পাড়ি জামান। দেনা শোধ করে বাড়ি ফেরা ও বিয়ের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল দুই ভাইয়ের, কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
একই গ্রামের রুবেল প্রামাণিক মাত্র ১৪ দিন আগে এক কন্যাসন্তানের বাবা হয়েছিলেন। সাড়ে ছয় বছর পর দেশে এসে ছুটি কাটিয়ে মাত্র তিন মাস আগে আবার কর্মস্থলে ফিরেছিলেন তিনি। তার এই আকস্মিক মৃত্যুতে সদ্যোজাত সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার।
অন্যদিকে, উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ঋণ করে প্রবাসে যাওয়া ফরিদের উপার্জনেই চলছিল পুরো পরিবার। তার বাবা ময়েন শেখ জানান, ফরিদের ওপর ভরসা করেই সংসার চলছিল ও ঋণ শোধ হচ্ছিল; এখন তারা কীভাবে বাকি ঋণ শোধ করবেন এবং সংসার চালাবেন—তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে নিহত হাসিবুল হাসান শুভর চাচা আনোয়ারুল ইসলাম জানান, কারখানাটিতে শ্রমিকেরা দিনে ঘুমাতেন এবং রাতে কাজ করতেন। দুর্ঘটনার সময় কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে বন্ধ থাকায় ঘুমন্ত শ্রমিকেরা বের হতে পারেননি বলে অভিযোগ স্বজনদের।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে। আইনি ও প্রশাসনিক সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দ্রুত দেশে আনার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি নিহতদের পরিবারের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
.png)


