logo
Advertisement

নীলফামারীতে কমছে পাট চাষ, বাড়ছে ভুট্টা

এশিয়া পোস্ট নিউজ, নীলফামারী
নীলফামারীতে কমছে পাট চাষ, বাড়ছে ভুট্টা
বাঁশের আড়ে শুকাতে দেওয়া হয়েছে সদ্য ছাড়ানো পাটের আঁশ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

একসময় নীলফামারীর গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল পাট। ‘সোনালী আঁশ’ হিসেবে পরিচিত এই ফসল ছিল কৃষকের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল। পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, শুকানো ও বাজারজাতকরণকে ঘিরে বর্ষাকালে গ্রামাঞ্চলে তৈরি হতো বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে কৃষকের সেই চেনা হিসাব। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট ও জাগ দেওয়ার পানি-সংকটসহ নানা অনিশ্চয়তার কারণে পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেক কৃষক।

Advertisement

অন্যদিকে তুলনামূলক কম সময়ে ফসল ঘরে তোলা, পরিচর্যার ঝামেলা কম থাকা এবং বাজারে ভালো চাহিদা থাকায় কৃষকের কাছে বাড়ছে ভুট্টার আকর্ষণ। ফলে নীলফামারীর বিভিন্ন এলাকায় পাটের জমিতে জায়গা করে নিচ্ছে ভুট্টা। কৃষকের এই ফসল পরিবর্তন শুধু একটি ফসলের জায়গায় আরেকটির আবাদ নয়; বরং এটি উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে লাভ-ঝুঁকির নতুন হিসাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে এখন আর আগের মতো পাট চাষ চোখে পড়ে না। অনেক জমিতে আগে ভুট্টা চাষের পর এখন ধান আবাদ করা হয়েছে।

কৃষকেরা বলছেন, ফসল নির্বাচন এখন আর শুধু অভ্যাসের ওপর নির্ভর করছে না। উৎপাদন খরচ, সময়, শ্রম, বাজারদর ও বিক্রির নিশ্চয়তা—সব হিসাব করেই তারা জমিতে ফসল বুুনছেন।

এ বিষয়ে কৃষক জলিল মিয়া বলেন, পাট চাষ এখন আর আগের মতো করা হয় না। এর প্রধান কারণ জাগ দেওয়া। পাট কাটার পর আঁশ পচানোর জন্য দীর্ঘ সময় পানিতে জাগ দিতে হয়। কিন্তু অনেক এলাকায় প্রয়োজনীয় গভীর ও পরিষ্কার পানি পাওয়া যায় না। ফলে পাট চাষিকে দূরের জলাশয়ে যেতে হয়, নয়তো কৃত্রিম ব্যবস্থা করতে হয়।

আরেক কৃষক অরবিন্দু রায় বলেন, পাট চাষ করলে এখন ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। বৈরী আবহাওয়ার কারণে পাট বোনার পর হঠাৎ বৃষ্টি হয়ে জমিতে পানি জমে গেলে চারা আর বাড়ে না। এছাড়া পাট কাটা, আঁটি বাঁধা, বহন, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর প্রতি ধাপে প্রচুর শ্রমিক লাগে। শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় এই খরচ অনেক বেড়ে গেছে।

কৃষকদের দাবি, পাটের বাজারদর ভালো থাকলেও অতিরিক্ত শ্রমিক খরচ, বৈরী আবহাওয়া ও প্রত্যাশিত ফলন না পাওয়ার কারণে লোকসানের আশঙ্কা থাকে। তাই ঝুঁকি এড়াতে তাঁরা অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।

কৃষকদের মতে, ভুট্টার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি স্বল্প সময়ে ঘরে তোলা যায়। পাটের মতো জাগ দেওয়া বা দীর্ঘ প্রক্রিয়াজাতকরণের ঝামেলা নেই। শুকিয়ে সংরক্ষণ ও পরিবহন সহজ। পাশাপাশি পশুখাদ্য ও পোলট্রি ফিড তৈরিতে ভুট্টার ব্যাপক চাহিদা থাকায় বাজারে বিক্রির নিশ্চয়তা থাকে। ফলে একই জমিতে পরবর্তী ফসল আবাদের সুযোগও পাওয়া যায়।

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার একাধিক কৃষক জানান, আগে নিয়মিত পাট চাষ করলেও এখন জমির বড় অংশে ভুট্টা আবাদ করছেন।

উপজেলার কৃষক জামিয়ার রহমান বলেন, পাট চাষ মানেই আতঙ্ক—নিড়ানি, সার, আর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ কাটা ও জাগ দেওয়া নিয়ে। কিন্তু ভুট্টা চাষের ক্ষেত্রে নিড়ানি ও সার নিজেই দেওয়া যায়। ফসল তোলার পর তা ভাঙার জন্য এখন মেশিন পাওয়া যায়। তাই পাটের মতো দুশ্চিন্তা থাকে না।

আরেক কৃষক লোকমান হোসেন বলেন, কৃষক এখন লাভের হিসাব করে চাষ করেন। যে ফসলে সময় কম লাগে, খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং বিক্রি করে দ্রুত টাকা পাওয়া যায়, স্বাভাবিকভাবেই সেদিকেই আগ্রহ বেশি।

তবে অভিজ্ঞ কৃষকদের অনেকে বলছেন, বাজারদর ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পাট এখনো লাভজনক হতে পারে। কিন্তু ন্যায্যমূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা থাকায় অনেকে ঝুঁকি নিতে চান না।

এ বিষয়ে ডোমার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে ডোমারে ৯৫০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে এবং এবার পাটের দামও মোটামুটি ভালো। তবে গত ২-৩ বছর ধরে দেশে পাট জাগ দেওয়া নিয়ে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি হঠাৎ বৃষ্টির মতো বৈরী আবহাওয়া ও শ্রমিক সংকটের কারণেও কৃষকদের আগ্রহ কিছুটা কমছে।

একসময় যে পাট ছিল নীলফামারীর কৃষকের অর্থনৈতিক আশার কেন্দ্রবিন্দু, সেই জমিতেই এখন ঝুলছে ভুট্টার শিষ। মাঠের এই রূপান্তর কেবল ফসলের পরিবর্তন নয়—এটি কৃষকের বদলে যাওয়া অর্থনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। কৃষক এখন আর আবেগে নয়, হিসাবের ভিত্তিতে ফসল বেছে নিচ্ছেন। সেই হিসাবকে পাটের পক্ষে ফেরাতে হলে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ—প্রতিটি ধাপে কৃষকের ঝুঁকি কমানোই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।