logo
Advertisement

মাতৃসেবার ‘জীবন্ত দলিল’ লালমন বিবি

রাকিব হাসান,মাদারীপুর
মাতৃসেবার ‘জীবন্ত দলিল’ লালমন বিবি
ধাত্রী লালমন বিবি। সম্প্রতি তার বাড়িতে তোলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

যখন চিকিৎসাসেবা ছিল দুর্লভ, হাসপাতাল ছিল অনেক দূরের পথ, তখন একটি নামই ছিল গ্রামীণ জনপদের ভরসা লালমন বিবি। বয়স তার এখন ৮৮। তবুও কোনো অন্তঃসত্ত্বা মায়ের প্রসববেদনার খবর পেলে নদী পেরিয়ে, কাদা-মাটি মাড়িয়ে ছুটে যান তিনি। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে মাতৃসেবার এক অনন্য ইতিহাস গড়ে তুলেছেন এই প্রবীণ ধাত্রী।

Advertisement

মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা লালমন বিবির জীবন যেন মাতৃসেবার এক জীবন্ত দলিল। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নয়, বরং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো হয়ে উঠেছে তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

মাত্র ১৫ বছর বয়সে আবদুল মালেক হাওলাদারের সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন লালমন বিবি। বিয়ের আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। হাতের মেহেদির রঙ ফিকে হওয়ার আগে, বিয়ের তিন দিনের মাথায় তাকে ছুটে যেতে হয়েছিল এক প্রসূতি মায়ের পাশে। সেখান থেকে শুরু হয় এক দীর্ঘ মাতৃসেবার পথচলা।

১৯৫৩ সালের ডিসেম্বর মাসে মাদারীপুর টিবি ক্লিনিকে চিকিৎসকদের দেওয়া মাত্র এক দিনের প্রশিক্ষণ তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই অল্প প্রশিক্ষণকে পুঁজি করে শুরু হয় ধাত্রীসেবা। এরপর কেটে গেছে প্রায় ৭০ বছরেরও বেশি সময়। এই দীর্ঘ সময়ে তার হাত ধরে নিরাপদে পৃথিবীর আলো দেখেছে ৮ থেকে ১০ হাজার নবজাতক।

স্থানীয়দের কাছে লালমন বিবি শুধু একজন ধাত্রী নন, তিনি আস্থা, সাহস এবং মানবতার প্রতীক। বহু পরিবার বিশ্বাস করে, সংকটের মুহূর্তে তার উপস্থিতিই ছিল সবচেয়ে বড় ভরসা। এমনকি ইউনিয়নের স্বাস্থ্যকর্মীরাও বিভিন্ন বিষয়ে তার অভিজ্ঞতার পরামর্শ নেন।

স্থানীয় পশ্চিম মাদ্রা এলাকার বিলকিস বেগম স্মৃতিচারণ করে জানান, তার প্রথম সন্তান লালমন বিবির হাতেই নিরাপদে জন্ম নেয়।

রাজারচরের সেফালী বেগম বলেন, আমাদের মতো গরিব মানুষের কাছে তিনিই ছিলেন ডাক্তার। তার সহযোগিতা ছাড়া হয়তো আমি মা হতে পারতাম না।

লালমন বিবির সংসারে রয়েছে এক ছেলে ও তিন মেয়ে। বড় ছেলে ছোটবেলায় মারা যান। সীমিত সামর্থ্যের সংসার চালিয়ে তিনি কখনও মানবসেবা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। অনেক সময় টানা কয়েক দিন বাড়ির বাইরে থেকে প্রসূতির সেবা দিয়েছেন। এমনও দিন গেছে, একদিনে পাঁচ থেকে ছয়টি প্রসব করাতে হয়েছে তাকে। নিজের সন্তানরা না খেয়ে থাকলেও তিনি ফিরেছেন অন্যের সন্তানের নিরাপদ জন্ম নিশ্চিত করে।

তার সেবার পরিধি শুধু প্রসবকালীন সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়। কোনো নারী মারা স্বেচ্ছায় গোসল করানোর দায়িত্বও পালন করেন তিনি। অনেক সময় নিজের খরচে এক ইউনিয়ন থেকে আরেক ইউনিয়ন, নদীর এপার-ওপার কিংবা দূর-দূরান্তের গ্রামে ছুটে গেছেন শুধু একজন মানুষের উপকার করতে।

স্থানীয় ঝাউদি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. লোকমান বেপারী জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখে আসছেন, লালমন বিবি ডাক পেলেই ছুটে যান। তার কাছে কখনো শত্রু-মিত্রের ভেদাভেদ ছিল না; মানুষের জীবন বাঁচানোই ছিল সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

লালমন বিবি বলেন, মানুষের উপকার করাই আমার সবচেয়ে বড় শান্তি। অনেক সময় নিজের টাকায় মানুষের সেবা করেছি। কোনোদিন কারও কাছে পারিশ্রমিক চাইনি। আল্লাহর রহমতে হাজার হাজার মায়ের প্রসব করিয়েছি, অসংখ্য মৃত নারীকে গোসল করিয়েছি। যাদের পৃথিবীতে এনেছি, তারা আজ অনেকেই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু খুব কম মানুষই আমার খোঁজ নেয়। আমার একটাই চাওয়া সরকার যেন আমাদের মতো ধাত্রীদের কাজের মূল্যায়ন করে।

এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, উপজেলা প্রশাসন তার পাশে থাকার চেষ্টা করবে। প্রয়োজনে তাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কথা বলা হবে।

মাদারীপুর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) মাহমুদা আক্তার কণা জানান, লালমন বিবি দীর্ঘ দিন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে ধাত্রীসেবা দিয়ে আসছেন। তার দক্ষতা ও আন্তরিকতার কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় তিনি সুপরিচিত এবং সম্মানিত।