logo

কোটি টাকার বহুতল ভবনে যেতে চান না হরিজনরা

কোটি টাকার বহুতল ভবনে যেতে চান না হরিজনরা

বগুড়া পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ হতে যাচ্ছে আধুনিক আবাসিক ভবন। সরকারি এই প্রকল্পে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা থাকলেও হরিজন সম্প্রদায়ের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বহুতল ভবনে বাস করতে চান না। এসব দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কারণে প্রায় দুই বছর আগের প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছে চলতি মাসের শেষের দিকে।

বগুড়া পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বগুড়ায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য দুটি বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। অনুমোদন অনুযায়ী, চকসূত্রাপুরে বসবাসরত হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষদের জন্য ৭২টি ফ্ল্যাট এবং কাটনারপাড়ায় ৪৮টি ফ্ল্যাট নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর সেটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ।

সদর উপজেলা প্রকৌশল দপ্তর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে চকসূত্রাপুর এলাকায় হরিজন কলোনিতে ১৮ কোটি ৪৬ লাখ ৯১ হাজার ৬৮৩ টাকায় সাত তলাবিশিষ্ট ভবন তৈরির বরাদ্দ হয়। ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই এই কাজের জন্য ইলেকট্রো গ্লোব নামে একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়। প্রথম দফায় কাজের মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের ২৪ আগস্ট। সেই মেয়াদে কাজ শুরু করতে না পারায় নতুন করে চুক্তি হয়। পরবর্তী মেয়াদ করা হয় ২০২৭ সালের ২৪ আগস্ট। কাজ শেষে ভবনটি বগুড়া পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করবে এলজিইডি।

সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানায়, দুই কলোনিতে ভবনের কাজের কথা থাকলেও কাটনারপাড়ায় এখনও কাজ ‍শুরু হয়নি। এ ছাড়া কাটনারপাড়ায় চাহিদা ছিল ৪৮টি ফ্ল্যাটের, কিন্তু স্থান সংকটে ৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা যাবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সরকারের প্রকৌশল বিভাগ। 

এ বিষয়ে খোঁজ নিলে ওই কলোনির বাসিন্দা সবুজ হরিজন বলেন, আমাদের এখানে ৬৫ ঘর হরিজন আছে। ৪৮টি ফ্ল্যাট হলেও তো অনেকে বাদ পড়ছে। এমন হলে আমাদের ভবন দিয়ে লাভ নেই। বরং এখন যেমন আছি, এভাবেই ভালো আছি।  

কিন্তু কাজ শুরু করতে গিয়ে কলোনির ভেতরে স্থান নির্বাচনে সমস্যায় পড়ে এলজিইডি। কলোনির পূর্ব পাশে বসবাসরত হরিজন সম্প্রদায়ের লোকজন বহুতল ভবন নিতে অস্বীকার করেন। এ ছাড়া তারা নিজেদের আবাস ছাড়তে রাজি হচ্ছিলেন না। পরে কলোনির পশ্চিম পাশের প্রবেশপথের দিকে স্থান নির্ধারণ করা হয়।

এখানে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হলেও এখনও অধিকাংশ পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বহুতলা ভবনে থাকতে চান না। সরেজমিনে দেখা গেছে, হরিজন কলোনির প্রবেশমুখের ঘরবাড়ি সরিয়ে পাশের একটি জমিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। সেখানে টিন দিয়ে তাদের অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আর ফাঁকা ওই স্থানে ভবনের ভেতরের জন্য মাটি খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। তবে ঈদের ছুটির কারণে কাজ আপাতত বন্ধ।

এখানকার বাসিন্দারা জানান, বহুতল ভবন নিয়ে তাদের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। কারণ, হরিজন সম্প্রদায়ের লোকজন সবাই মদপানে অভ্যস্ত। বয়স্ক নারী-পুরুষ মদ্যপ অবস্থায় উঁচু স্থানে, সিঁড়ি বেয়ে চলাচলে নিরাপদ মনে করেন না। এ ছাড়া তারা স্বাভাবিক জীবনযাপনে বহুতল ভবনে স্বস্তিবোধ করেন না।

অনেকে জানান, অস্থায়ী টিনের ঘরে বসবাস করতে তাদের অসুবিধা হচ্ছে। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতর পানি পড়ছে। আবার রোদে গরম লাগছে। কত দিনে ভবন নির্মাণ হবে তা নিয়ে সংশয় আছে তাদের।

সনি হরিজন নামে এক যুবক বলেন, ‘বিল্ডিং হলে তো সুবিধা আছে। কিন্তু আমরা তো যেতে চাই না। কারণ আমরা যেভাবে চলি, আমাদের খাওয়া-দাওয়া আপনারা জানেন। এতে সাততলা বিল্ডিংয়ে থাকা ঝুঁকির। আবার আমাদের সবার তো গ্যাসের চুলায় রান্না করার টাকা নেই। খড়ি, পাতা দিয়ে রান্না করি। বিল্ডিংয়ে থাকলে কি মাটির চুলায় রান্না করতে পারব।’

তপু হরিজন বলেন, ‘ভবন প্রথমে কলোনির পূর্ব পাশে হওয়ার কথা ছিল। ওই পাশটায় ডোম গোত্রের লোকজন বাস করে। ওরা কিন্তু ওপর থেকে পড়ে যেতে পারে, এই ভয়ের কারণে করতে দেয়নি। ওদের কথা ছিল, বর্তমান বাড়ি দোতলা করে দিলে তারা থাকবে। কিন্তু সাততলা-দশতলায় তারা যাবে না। এখন আমাদের এখানে ভবন নির্মাণে রাজি হয়েছি আমরা, কিন্তু একই ভয় তো আমাদেরও আছে।’

ডোমদের অংশে গিয়ে গোবিন্দ বাঁশফোড়ের সঙ্গে কথা হয়। বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘ওরা যখন জায়গা দেখতে এসেছিল, আমরা বলেছিলাম এখানে যে দোতলা ঘর আছে, একটা মন্দির আছে, এগুলো ভাঙা যাবে না। কিন্তু ওরা শুনেনি। পরে ওরা সামনে বিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেন।’

চকসূত্রাপুর কলোনির প্রবীন বাসিন্দা বিমল কুমার হাঁড়ি বলেন, ‘অনেক দিন ধরে বিল্ডিং বানানোর কথা হচ্ছে। এখন কবে হবে, সেই বিল্ডিং টিকবে নাকি ধসে পড়বে, সেটা আল্লাহ ছাড়া কেউ বলতে পারে না। আবার বিল্ডিং হলেও সেখানে আমরা থাকব কীভাবে? ছাদ থেকে কেউ যদি পড়ে যায়? এগুলো কি সরকার দেখবে?’

চকসূত্রাপুরের কলোনিতে হরিজন সম্প্রদায়ের প্রায় ৩০০ ঘর আছে বলে জানান বাংলাদেশ হরিজন ঐক্যপরিষদের সহসভাপতি টুটুল হরিজন। তিনি বলেন, প্রথমে জায়গা নির্ধারণ করতে গিয়ে সমস্যা হয়েছিল। ডোমরা তাদের জায়গা দেয়নি। এসব কারণে এই ভবন নির্মাণে দেরিও হলো। আগে যে সমস্যা ছিল, এখন আর সেটি নেই। ভবন হলে সবার জন্য ভালোই হবে। এটা হওয়ার পর এখানে আরেকটি দশ তলা ভবন হবে।

ইলেকট্রো গ্লোব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাইট প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, চকসূত্রাপুর কলোনিতে প্রায় ৯ হাজার স্কয়ার ফুট আয়তনের ওপর ৭তলা ভবন হবে। নিচতলা থাকবে কমিউনিটি সেন্টার। দোতলা থেকে প্রতি ফ্লোরে ১২টি করে ছয় তলায় মোট ৭২টি ফ্ল্যাট নির্মাণ হবে। কাজ শুরুতে আমাদের যা দেরি হয়েছে, এখন আর কোনো সমস্যা নেই। কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করে ফেলব।

প্রকল্পটির শুরু থেকে নানা রকম সমস্যায় পড়তে হয়েছে বলে জানান বগুড়া সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. মোবারক হোসেন। তিনি বলেন, আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ইচ্ছা থাকলে সুন্দরভাবে ভবন নির্মাণ করে বাস করতে পারে না। এলজিইডি একটি উদ্যোগ নিয়েছে সারা দেশে। বগুড়া সদরে দুটি ভবন নির্মাণ হচ্ছে। চকসূত্রাপুরে পশ্চিম পাশে নির্মাণ করতে গিয়ে সমস্যা হয়েছিল। পরে পুনরায় সয়েল টেস্ট, ডিজাইন করতে হয়। এখন পুরোদমে কাজ চলবে। কাটনারপাড়ায় জায়গা সংকট আছে। সেখানে ৪৮টি হবে না। তবে আমরা ৩৬টি ফ্ল্যাট করতে পারব।