Advertisement

জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যা মামলায় কারাগারে ‘জুলাই যোদ্ধা’

শরীফুজ্জামান ফাহিম, সাভার (ঢাকা)
জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যা মামলায় কারাগারে ‘জুলাই যোদ্ধা’
সাভারের রাস্তায় জুলাই যোদ্ধা মেহেদী হাসান রিয়াজ (বাঁ থেকে ভি চিহ্ন দেখানো দ্বিতীয় জন)। ছবি: সংগৃহীত

উত্তাল রাজপথ। চারদিকে গুলির শব্দ। সময়টা ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের। সে সময় সাভারের রাস্তায় অন্যদের মতো বুক চিতিয়ে লড়েছিলেন মেহেদী হাসান রিয়াজ। পটপরিবর্তনের পর জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সময় হত্যা মামলায় তিনি হয়েছেন আসামি। গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন এই ‘জুলাই যোদ্ধা’।

রিয়াজের বিরুদ্ধে হওয়া সাভার মডেল থানায় মামলাটি হয়েছে ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর। নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে ১৫৩ জনকে। অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে ১০০/১৫০ জনকে। মামলার বাদী নিপু আলী জামালপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা। অভিযোগ আনা হয়েছে, জামালপুর সদর উপজেলার মো. বিল্লালের ছেলে সুমন হাসানকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রিয়াজসহ অন্য আসামিরা হত্যা করেছে।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ঘটনার দিন বিকেলে নামাবাজার যাওয়ার উদ্দেশ্যে সাভার মডেল থানাধীন ব্যাংক কলোনী (তালবাগ) সাকিনস্থ ভাড়া বাসা থেকে বের হন সুমন। সন্ধ্যার দিকে বাদী জানতে পারেন তার ভাতিজা সুমন সাভার থানাধীন রেজিষ্ট্রি অফিস মোড়ে চৌরাস্তায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। বাদী খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন আন্দোলন করার সময় সুমনসহ ২০০/৩০০ জন আন্দোলনকারীকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগও ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা ও গুলি করে। ধাওয়া খেয়ে সুমন নামাবাজার যাওয়ার সময় রেজিষ্ট্রি অফিস চৌরাস্তার মোড়ে আসামিদের ছোঁড়া গুলিতে ঘটনাস্থলে মারা যায়।

সাভার থানা সূত্রে জানা যায়, থানার ০৪/২৪ নম্বর মামলাটিতে রিয়াজকে গ্রেপ্তার করে গত ১৪ জুলাই আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। আদালেতে পাঠানোর সময় রিয়াজের নামের পাশে রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে দেখানো হয়েছে ছাত্রলীগ কর্মী।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) চম্পক বড়ুয়া এশিয়া পোস্টকে জানান, মেহেদী হাসান রিয়াজ এজাহারভুক্ত আসামি হওয়ায় নিয়মিত অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন।

অনুসন্ধান বলছে, সাভারে আন্দোলনকারীদের সাক্ষাৎকার ও একাধিক ছবি বিশ্লেষণে জুলাই আন্দোলনে রিয়াজের সক্রিয় সম্পৃক্ততার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। সাভার নিউমার্কেটের ভূগর্ভস্থ ‘আদিল এক্সপোর্ট’ নামের একটি কাপড়ের দোকানে গত কয়েক বছর ধরে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন তিনি। গত ১৩ জুলাই বিকেলে প্রতিদিনের মতো দোকানে কর্মরত অবস্থায় সাভার থানা পুলিশের একটি টিম তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়।

‘আদিল এক্সপোর্ট’ এর স্বত্বাধিকারী মো. ইব্রাহিম বলেন, রিয়াজ সাত-আট বছর ধরে আমার দোকানে কাজ করছে। সে ভীষণ ভালো ও নিরীহ প্রকৃতির একটা ছেলে। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কখনও যুক্ত ছিল না। গত ১৩ জুলাই বিকেল বেলা দোকান থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

রিয়াজ গ্রেপ্তার হওয়ার পর সহযোদ্ধার ফেসবুক পোস্ট।
রিয়াজ গ্রেপ্তার হওয়ার পর সহযোদ্ধার ফেসবুক পোস্ট।

আন্দোলনের সময় রিয়াজের উপস্থিতির তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরে সহযোদ্ধা মেহেদী হাসান মুন্না বলেন, ১৮ জুলাই যখন সাভারে বেপরোয়া গুলি ও টিয়ারশেল চালানো হচ্ছিল রিয়াজ আমাদের সঙ্গে সামনের সারিতে ছিল। টিয়ারগ্যাসের প্রভাব কমাতে সে কাঠ-খড় জোগাড় করে আগুন জ্বালিয়ে সাহায্য করেছিল। যে ছেলেটা জীবন বাজি রেখে লড়ল, তাকে কীভাবে আন্দোলনের সময়ের হত্যাকারী বানানো হয়।

রিয়াজের বোন মরিয়ম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা দুই ভাই-বোন পরিবারের অমতে আন্দোলনে গিয়েছিলাম। ১৯ জুলাই যখন সাভারে হামলা চালানো হয় তখনও আমার ভাই রাজপথে ছিল। সে সম্পূর্ণ নির্দোষ। তার উপার্জনের টাকা দিয়ে আমাদের পড়ালেখা ও অসুস্থ বাবার ডায়াবেটিসের চিকিৎসা চলে। তদন্ত না করে আমার ভাইটাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে।

এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, যদি সে সত্যিই জুলাই যোদ্ধা হয়ে থাকে এবং তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আসামি করা হয়ে থাকে, তবে তা দুঃখজনক। আইনের নতুন যে সংশোধনী এসেছে, তার মাধ্যমে এই ধরনের হয়রানি থেকে তাকে আইনি রেহাই দেওয়া উচিত।

রিয়াজের বাবা বেলাল উদ্দিন মনা দাবি করেন, মামলাটির নেপথ্যে রয়েছে ব্যবসা সংক্রান্ত বিতর্ক ও পারিবারিক আত্মীয়তার সুযোগে তৈরি হওয়া শত্রুতা। প্রতিপক্ষ একটি গোষ্ঠী রিয়াজ ও তার বড় ভাই রিয়াদকে মামলায় জড়িয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, সাভার পৌরসভার সাবেক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক সম্পর্কে রিয়াজের ফুফা। রাজ্জাক কারাবন্দী হয়ে মারা যাওয়ার পর তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ ভাগ হয়ে যায়। একটি অংশ দেখাশোনার দায়িত্ব পাই আমি। দায়িত্ব ও পরিচালনা ব্যহত করতে প্রতিপক্ষ আমার ছেলের নামে সাজানো মামলা দিয়েছে।

সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, তৎকালীন সময়ের বিস্তারিত তথ্য তার জানা ছিল না। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতে সোপর্দ করার নথি ও আন্দোলনকারী হওয়ার প্রমাণ জমা দিলে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন। কোনো কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয় :সাভার