
এক সময়ের প্রাণচঞ্চল শ্রেণিকক্ষগুলোতে এখন যেন এক নিঝুম নীরবতা। সকাল হলেই নীলফামারীর শহর ও গ্রামের রাস্তাগুলোতে বই-খাতা হাতে শিশুদের যে দৌড়ঝাঁপ দেখা যেত, তা আজ ম্লান হতে বসেছে। নীলফামারীর শিক্ষা ব্যবস্থায় এখন এক বিপরীত চিত্র। সরকারি নথিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সন্তোষজনক হলেও বাস্তবে জেলাজুড়ে অনেক স্কুলের শ্রেণিকক্ষ ও বেঞ্চ খালি পড়ে থাকছে।
সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরুলেও গত ১ বছরে মাধ্যমিকে ঝরে পড়েছে জেলার ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়গুলোর সার্বিক পরিবেশ ও সংকটের ধরণ ভিন্ন হলেও উভয় ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শহরাঞ্চলে তুলনামূলক উপস্থিতি ভালো হলেও সরকারি স্কুলের সঙ্গে অনুমোদন পাওয়া কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা।
অন্যদিকে, গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য, কৃষি বা পারিবারিক কাজে শিশুদের যুক্ত হওয়া, বাল্যবিয়ে এবং অভিভাবকদের স্থানান্তরের মতো সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো শিক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করছে।
কাগুজে হিসাব ও বাস্তবতার ফারাক
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে নীলফামারীতে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬১৭ জন, যা ২০২৫ সালের ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৫ জনের তুলনায় ২ হাজার ৬২ জন বা প্রায় ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। জেলায় মোট ১ হাজার ৮৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৯৩৮টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে সরকারি খাতায় শিক্ষার্থী বৃদ্ধির তথ্য থাকলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। অনেক স্কুলেই রেজিস্টারে শতাধিক নাম থাকলেও নিয়মিত উপস্থিতি হাতে গোনা।

অন্যদিকে, মাধ্যমিকের চিত্র আরও আশঙ্কাজনক। সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থী ছিল ৫৩ হাজার ৮৪৫ জন। তার মধ্যে স্কুলে ৪৩ হাজার ২২৫ জন, মাদ্রাসায় ৭ হাজার ৭০০ জন, ভোকেশনালে ২ হাজার ৯২০ জন। ২০২৬ সালে তা এক লাফে কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৮০৪ জনে। যার মধ্যে স্কুলে ৩৫ হাজার ৪৬৪ জন, মাদ্রাসায় ৭ হাজার ৫৭০ জন এবং ভোকেশনালে ২ হাজার ৭৭০ জন। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সদর উপজেলাতেই মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী কমেছে ৮ হাজার ৪১ জন ,অর্থাৎ প্রায় ১৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে স্কুল পর্যায়ে, যেখানে ঝরে পড়েছে ৭ হাজার ৭৬১ জন বা ১৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী।
ক্লাসে উপস্থিতি হাতে গোনা
সরেজমিনে সদর উপজেলার একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায় বাস্তবতার করুণ চিত্র। ক্লাসে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখা যায় হাতে গোনা। খালি পড়ে আছে অধিকাংশ বেঞ্চ।
লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়নের দুবাছুরী মালিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০২৬ সালে খাতা-কলমে মোট ৮৩ জন শিক্ষার্থী থাকলেও সরেজমিনে উপস্থিতি পাওয়া গেছে মাত্র ৩৬ জন, যা প্রায় ৪৩ শতাংশ কম। এর মধ্যে শিশু শ্রেণিতে ২০ জনের মধ্যে ১২ জন, প্রথম শ্রেণিতে ১৫ জনের মধ্যে ১০ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ জনের মধ্যে ৭ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ১৬ জনের মধ্যে ৭ জন উপস্থিত ছিল। তবে খাতা অনুসারে তৃতীয় শ্রেণির ১০ জন ও চতুর্থ শ্রেণির ১২ জনের কোনো শিক্ষার্থীকেই ক্লাসে পাওয়া যায়নি। ২০২৫ সালে এই স্কুলে ১০১ জন শিক্ষার্থী ছিল, যা এক বছরে প্রায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে।

আইপিইএমআইএস -এর তথ্যে ৩৪ নম্বর শালমারা গোড়কপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬১ জন শিক্ষার্থী দেখানো হয়। তবে ২০২৬ সালে বিদ্যালয়টির তথ্যে ৭৮ জন শিক্ষার্থী উল্লেখ করা হলেও দ্বিতীয় প্রান্তিক পরীক্ষার খাতায় ৪০ জনেরও কম শিক্ষার্থীর উপস্থিতির প্রমাণ মেলে। সরেজমিনে শিশু শ্রেণিতে ২৫ জনের মধ্যে ১৭ জন, প্রথম শ্রেণিতে ১৫ জনের মধ্যে ১১ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৭ জনের মধ্যে ৫ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ১১ জনের মধ্যে ৫ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ১১ জনের মধ্যে ৩ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ৯ জনের মধ্যে ৪ জন উপস্থিত দেখা যায়।
কচুয়া চৌরঙ্গী সেবা স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ৫১৩ জন, যা ২০২৬ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫০ জনে। এক বছরেই ঝরে পড়েছে ৬৩ জন অর্থাৎ ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির মতে, প্রতি বছর গড়ে ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।
কেন ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা
অনুসন্ধানে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া ও অনুপস্থিতির একাধিক কারণ উঠে এসেছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা, বাল্যবিয়ে এবং দারিদ্র্য ও শিশ শ্রম তাদের মধ্যে অন্যতম।
পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে অনেক কিশোর আয়-রোজগারে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে। নীলফামারী নতুন দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ঝরে পড়া শিক্ষার্থী মো. হাসিব জানায়, পরিবারের পাঁচ সদস্যের খরচ চালাতে তাকে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নামতে হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, নীলফামারী জেলায় ১৮ বছরের আগে ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ১৫ বছরের আগেই ৭ দশমিক ৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাল্যবিয়ে হওয়া এক কিশোরী আক্ষেপ করে জানান, ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও পরিবারের চাপে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তার পড়ালেখা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।
নীলফামারী শহরের পাশে উত্তরা ইপিজেড ঘিরে কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় মাধ্যমিক স্তরের অনেক শিক্ষার্থীই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে অল্প বয়সে কাজে যোগ দিচ্ছে।
সম্প্রতি নীলফামারী জেলায় নতুন করে ৫৮টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল অনুমোদন পেয়েছে। সেগুলোর মধ্যে সদরে ২১টি, ডিমলায় ১৭টি, কিশোরগঞ্জে ১১টি, জলঢাকায় ৬টি ও ডোমারে ৩টি। ফলে শহরের সরকারি স্কুলগুলো নতুন শিক্ষার্থী পেতে প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে।
এ ছাড়াও প্রযুক্তি আসক্তি ও সচেতনতার অভাবে সম্প্রতি মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তির কারণেও অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
শিক্ষকদের মতে, প্রাথমিকে শিক্ষার্থী কমার প্রভাব পরবর্তীতে মাধ্যমিকেও গিয়ে পড়ে। ফলে বিষয়টি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিকতার জন্য এক বড় হুমকি।
ডিমলা উপজেলার অভিভাবক আবদুল খালেক বলেন, কৃষি মৌসুমে বা দিনমজুরিতে পরিবারকে সহায়তা করতে গিয়ে শিশুরা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। শুধু সচেতনতা নয়, দরিদ্র পরিবারের জন্য শিক্ষা উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা বাড়ানো না গেলে ঝরে পড়া থামানো সম্ভব নয়।
নীলফামারীর ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে জানান, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে শিক্ষকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কথা বলছেন। তবে শুধু আর্থিক সমস্যা নয়, অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষকদের গাফিলতিও দায়ী। শিক্ষার্থী ধরে রাখতে অভিভাবক ও শিক্ষক দুই পক্ষকেই দায়িত্বশীল হতে হবে।
সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এটিএম নূরল আমীন শাহ্ এশিয়া পোস্টকে জানান, দারিদ্র্য, উত্তরা ইপিজেডের কর্মসংস্থান এবং মেয়েদের বাল্যবিয়েই মূলত শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। ঝরে পড়া রোধে সচেতনতামূলক কাজ চলছে।
তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো, নীলফামারীর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান এশিয়া পোস্টকে জানান, জেলা বা উপজেলাভিত্তিক মোট শিক্ষার্থীর তথ্য সংরক্ষণ করার কোনো প্রয়োজন তাদের পড়ে না এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও আলাদা করে পাঠাতে হয় না। তাই আমরা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ বা সংরক্ষণ করি না। কেবল শিক্ষার্থীদের চাহিদামতো পাঠ্যবই সরবরাহের তথ্যই তাদের সংরক্ষণে থাকে। সেই চাহিদার ভিত্তিতেই বই সরবরাহের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

