মানিকগঞ্জে ৪২ কলেজ-মাদ্রাসার ৩০টিতে নেই কোনো জিপিএ-৫

২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সবচেয়ে কম পাসের হার ও জিপিএ-৫ পেয়েছে মানিকগঞ্জ জেলা। জেলার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে। জেলার সাত উপজেলার ৩৫টি কলেজ ও সাতটি মাদ্রাসার মধ্যে ৩০টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাননি। এমনকি চারটি প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি। এসব প্রতিষ্ঠানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত জেলাভিত্তিক ফলাফল পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, ৪২টি কলেজ ও মাদ্রাসা থেকে মোট ১০ হাজার ৩৯৪ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন। তাদের মধ্যে পাস করেছেন ৩ হাজার ৯৬৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ৬ হাজার ৪২৯ জন। সম্মিলিত পাসের হার ৩৮ দশমিক ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থীই ফেল করেছেন। সাত উপজেলায় মোট জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৮৯ জন।
যেসব চারটি প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি, সেগুলো হলো ঘিওরের ড. আবদুর রহিম খান মহিলা কলেজ, সদর উপজেলার গোলাম মনির হোসেন গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দৌলতপুরের বাঘুটিয়া আলিম মাদ্রাসা এবং সাটুরিয়ার দরগ্রাম ফাজিল মাদ্রাসা। এসব প্রতিষ্ঠানে যথাক্রমে ১, ৭, ৯ ও ১৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
উপজেলাভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাসের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে দৌলতপুর। উপজেলার চারটি কলেজ ও একটি মাদ্রাসা থেকে ৫০৬ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন মাত্র ৭৮ জন। পাসের হার ১৫ দশমিক ৪২ শতাংশ। অকৃতকার্য হয়েছেন ৪২৮ জন। কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাননি। সরকারি মতিলাল ডিগ্রি কলেজে ৩৬২ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৪৯ জন। পাসের হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। তালুকনগর কলেজে ৪৫ জনের মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ছয়জন। পাসের হার ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বাঘুটিয়া আলিম মাদ্রাসার নয়জনের কেউই পাস করেননি।
দৌলতপুরের পর খারাপ অবস্থানে রয়েছে শিবালয় উপজেলা। এখানকার চারটি কলেজ থেকে ১ হাজার ৪৭৮ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ২৯৪ জন। পাসের হার ১৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ। অকৃতকার্য হয়েছেন ১ হাজার ১৮৪ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র পাঁচজন। মহাদেবপুর ইউনিয়ন সরকারি কলেজে ৬৮৫ জনের মধ্যে পাস করেছেন ১৪৩ জন। পাসের হার ২০ দশমিক ৮৮ শতাংশ। শিবালয় সদরউদ্দিন কলেজে ৭০২ জনের মধ্যে পাস করেছেন ১৩০ জন। পাসের হার ১৮ দশমিক ৫২ শতাংশ।
হরিরামপুর উপজেলার তিনটি কলেজ থেকে ৮১৯ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ২৬৪ জন। পাসের হার ৩২ দশমিক ২৩ শতাংশ। অকৃতকার্য হয়েছেন ৫৫৫ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র দুজন। ঝিটকা খাজা রহমত আলী কলেজে ৫১৩ জনের মধ্যে পাস করেছেন ১৬৫ জন। পাসের হার ৩২ দশমিক ১৬ শতাংশ। এম এ রউফ কলেজে ১০৪ জনের মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ২০ জন। পাসের হার ১৯ দশমিক ২৩ শতাংশ।
সাটুরিয়া উপজেলার দুটি কলেজ ও একটি মাদ্রাসা থেকে ৮৩৪ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ২৮২ জন। পাসের হার ৩৩ দশমিক ৮১ শতাংশ। অকৃতকার্য হয়েছেন ৫৫২ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র দুজন। সরকারি ভিকু মেমোরিয়াল কলেজে পাসের হার ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং সাটুরিয়া সৈয়দ কালুশাহ কলেজে ৩৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এ উপজেলায় দরগ্রাম ফাজিল মাদ্রাসার ১৭ জনের কেউই পাস করেননি।
সিংগাইর উপজেলার তিনটি কলেজ ও দুটি মাদ্রাসা থেকে ৯৬৭ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ৪০১ জন। পাসের হার ৪১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অকৃতকার্য হয়েছেন ৫৬৬ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র একজন। সিংগাইর কলেজে ৭৪৩ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৩২১ জন। পাসের হার ৪৩ দশমিক ২০ শতাংশ। গোলাইডাঙ্গা মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি কলেজে পাসের হার ৪৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
ঘিওর উপজেলার চারটি কলেজ ও একটি মাদ্রাসা থেকে ৭০৪ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ৩৮৮ জন। পাসের হার ৫৫ দশমিক ১১ শতাংশ। অকৃতকার্য হয়েছেন ৩১৬ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন চারজন। সরকারি ঘিওর কলেজে ৫৭৩ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৩৩৩ জন। পাসের হার ৫৮ দশমিক ১২ শতাংশ। তবে বানিয়াজুরী ইউনিয়ন সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১৯ জনের মধ্যে পাস করেছেন মাত্র একজন। পাসের হার ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ।
অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কলেজ ও মাদ্রাসাগুলো থেকে। এখানকার ১৫টি কলেজ ও দুটি মাদ্রাসা থেকে ৫ হাজার ৮৬ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ২ হাজার ২৫৮ জন। পাসের হার ৪৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। অকৃতকার্য হয়েছেন ২ হাজার ৮২৮ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৭৫ জন, যা জেলার মোট জিপিএ-৫-এর প্রায় ৮৪ দশমিক ২৭ শতাংশ।
সদরের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ থেকেই জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৭০ জন। কলেজটি থেকে ১ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ১ হাজার ১৯১ জন। পাসের হার ৬৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। তবে একই উপজেলার খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন কলেজে ৬৭ জনের মধ্যে পাস করেছেন মাত্র পাঁচজন। পাসের হার ৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ। অন্যদিকে কানিজ ফাতেমা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে পাসের হার ৮৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং মন্নো ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৯৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
সদরের দুটি মাদ্রাসা থেকে ৮২ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ৩৬ জন। পাসের হার ৪৩ দশমিক ৯০ শতাংশ। দোয়াত আলী আলিম মাদ্রাসায় ১৯ জনের মধ্যে ১২ জন পাস করেছেন। এ প্রতিষ্ঠান থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন দুজন।
সার্বিক ফলাফলে দেখা যায়, পাসের হারে ঘিওর উপজেলা সবচেয়ে এগিয়ে থাকলেও সেখানে ৪৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। বিপরীতে দৌলতপুরে প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৮৫ জনই ফেল করেছেন। আর জেলার মোট ৮৯ জন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর ৭৫ জনই সদর উপজেলার। বাকি ছয় উপজেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ১৪ জন।
ফলাফলের এ চিত্রে একদিকে যেমন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে জিপিএ-৫ না পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট, অন্যদিকে চারটি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পরীক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
