logo
Advertisement

গড়াই নদীতে উচ্চ শব্দে নাচ-গান, ভোগান্তিতে লাখো মানুষ

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ,কুষ্টিয়া
গড়াই নদীতে উচ্চ শব্দে নাচ-গান, ভোগান্তিতে লাখো মানুষ
গড়াই নদীতে উচ্চ শব্দে নাচ-গান, দুর্ভোগে লাখো মানুষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

শুক্রবার এলেই কুষ্টিয়ার গড়াই নদীতে শত শত আলোকসজ্জিত নৌকায় উচ্চ শব্দে শুরু হয় গান-নাচের আসর। বিনোদনের আড়ালে এখানে মাদক সেবন ও উশৃঙ্খলতা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। সেই সঙ্গে নদীর ওপর হরিপুর সংযোগ সেতুতে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামায় তৈরি হয় তীব্র যানজট। এতে চরম দুর্ভোগ ও ভোগান্তিতে পড়ছেন হরিপুর ইউনিয়নের প্রায় লাখো মানুষ।

Advertisement

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা যায়, গড়াই সেতুর প্রবেশমুখেই উৎসুক মানুষের চরম ভিড়। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে কয়েক হাজার মানুষ নদীতে চলাচলকারী নৌকার গান, নাচ ও আলোকসজ্জা উপভোগ করছেন। ফলে পথচারী, মোটরসাইকেল, অটোরিকশাসহ যানবাহন চলাচল একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুক্রবার এলেই হরিপুর ইউনিয়নের বাসিন্দাদের জন্য গড়াই সেতু পার হওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। জরুরি প্রয়োজনে কোনো রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া কিংবা অন্য কাজে শহরে আসা-যাওয়া করতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

হরিপুর এলাকার বাসিন্দা অপু বলেন, শুক্রবার হলেই আমরা কোনোভাবেই ঠিকমতো ব্রিজ পার হতে পারি না। মোটরসাইকেল, পায়ে হেঁটে কিংবা অটোতে পার হতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগে। কেউ অসুস্থ হয়ে গেলে তাকে হাসপাতালে নেওয়াটাও কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা দ্রুত এই সমস্যা থেকে নিস্তার চাই।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা লালটু বলেন, আমরা খুবই সমস্যার মধ্যে রয়েছি। নদীতে যেমন বিকট শব্দে গান-বাজনা হয়, তেমনি ব্রিজ দিয়েও ঠিকমতো পার হতে পারি না। এই কষ্ট থেকে নিস্তারের জন্য প্রশাসনের কাছে জোর আবেদন জানাচ্ছি।

অন্যদিকে ব্রিজে ঘুরতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী গিয়াস উদ্দিন বলেন, আমরা একটু বিনোদনের জন্য পরিবার নিয়ে এখানে আসি। কিন্তু এখন যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে পা রাখারও জায়গা নেই। আজ যে অবস্থা তৈরি হয়েছে, পরবর্তীতে অন্তত ব্রিজে কাউকে না দাঁড়াতে আহ্বান জানানোর মতো পরিবেশ হয়েছে।

এদিকে সরেজমিনে দেখা যায়, কুষ্টিয়া শহরের কমলাপুর বাঁধ থেকে মহাশ্মশানঘাট এবং অন্যদিকে হরিপুরের মোহনা থেকে কয়া ঘাট পর্যন্ত গড়াই নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় বড় বড় নৌকায় চলছিল পিকনিকের আয়োজন। ‘আরবিকে’, ‘ড্রাগন বয়’, ‘রেড এলার্ট’, ‘ক্ষ্যাপা কিং’, ‘মাফিয়া’, ‘জিরো পয়েন্ট’সহ বিভিন্ন নামে যুবগোষ্ঠী ও মহল্লাভিত্তিক নানা গ্রুপ এসব নৌকায় পিকনিকের আড়ালে উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে অশ্লীল ভঙ্গিতে নাচানাচি করছিল। কোনো কোনো নৌকায় প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ জন পর্যন্ত মানুষকে উঠতে দেখা গেছে। এসব আয়োজনে স্থানীয় তরুণদের পাশাপাশি বাইরের এলাকা থেকে বন্ধুদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়।

নৌকাগুলোকে সাজানো হয়েছে বাহারি আলোকসজ্জায়, যার সঙ্গে রয়েছে বিশালাকার সাউন্ড সিস্টেম। কে কত জাঁকজমকপূর্ণ নৌকা নামাতে পারেন এবং কে কত বড় সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করতে পারেন, তা নিয়ে চলছে আয়োজকদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

নৌকা-সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি নৌকা সাজানো ও সার্বিক আয়োজন করতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত। আর শুধু সাউন্ড সিস্টেমের পেছনেই ক্ষেত্রবিশেষে ব্যয় হচ্ছে ৫০ হাজার থেকে ৮ লাখ টাকা।

নৌকার এমন অনিয়ন্ত্রিত আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পিকনিকে অংশগ্রহণকারী শিমুল নামের এক তরুণ বলেন, আমরা তো কারও ডিস্টার্ব করছি না। একটু আনন্দের জন্য নৌকায় উঠি, গান করি। আমরা সবাই ভাই-ব্রাদার মিলে চাঁদা তুলে নৌকায় উঠেছি, কারও তো কোনো ক্ষতি করছি না।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু আনন্দ-বিনোদনের মধ্যে এসব আয়োজন সীমাবদ্ধ থাকছে না। উচ্চ শব্দে গান, অশ্লীল নাচ এবং উন্মুক্ত মাদক সেবনের অভিযোগও রয়েছে প্রবল। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ভবের হাট সংস্থার সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বিনোদনের অধিকার সবার আছে। কিন্তু সেই বিনোদনের কারণে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হলে, উচ্চ শব্দে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হলে কিংবা মাদক ও অশালীন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি আর নিছক বিনোদন থাকে না।

তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে নদীতে অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে বড় ধরণের নৌদুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়। একটি দুর্ঘটনাই কেড়ে নিতে পারে অসংখ্য প্রাণ। তাই নৌকার ধারণক্ষমতা, লাইফ জ্যাকেট, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নৌযানের বৈধতা এবং আয়োজকদের কর্মকাণ্ড নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনা জরুরি।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম জানান, অভিযান অব্যাহত আছে। নৌকার মালিকদের সাথে কথা বলেছিলাম। তবে মনে হচ্ছে, কিছু নৌকা জেলার বাইরে থেকেও এসেছে। গড়াই নদীতে নৌযান পিকনিক ও সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

বিষয় :