গাইবান্ধা/বাঁচানো গেল না চরের একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি

নদীভাঙনের ছোবলে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি, ফসলি জমি ও সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। গাইবান্ধায় নদীর পানি হ্রাস-বৃদ্ধির কারণে সৃষ্টি হওয়া তীব্র স্রোতে নদীর তীরবর্তী এলাকা ও চরাঞ্চল ভেঙে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে করে ভাঙ্গন ঝুঁকিতে রয়েছে শত শত সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনা।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ভাঙনের হাত থেকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেল না ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। নদী ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় বিদ্যালয়টি এখন বাধ্য হয়ে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়ায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, বিদ্যালয়টি চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নদীভাঙনে আশপাশের এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যালয়টি রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে আসছিলেন তারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউপি চেয়ারম্যান, ইউএনও, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন। তবে বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
সর্বশেষ গত ৮ আগস্ট পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করায় বিদ্যালয়টি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের আশা করেছিলেন স্থানীয়রা। কিন্তু সেই আশাও শেষ পর্যন্ত হতাশায় পরিণত হয়েছে। নদীভাঙ্গন থেকে বিদ্যালয়টি রক্ষা করা সম্ভব না হওয়ায় তা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবহেলার কারণেই শেষ পর্যন্ত বিদ্যালয়টি রক্ষা করা গেল না বলে অভিযোগ তাদের।
স্থানীয় যুবক কামাল হোসেন বলেন, শুকনো মৌসুমে নদীভাঙ্গন রোধে কাজ করা হলে বিদ্যালয়টিকে আজ অস্তিত্ব হারাতে হতো না।
কাপাসিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. জামাল উদ্দিন বলেন, টিও, এটিও, ইউএনও, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং ডিসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। নতুন করে যেন আর কোনো ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন তারা। বিশেষ করে চরবাসীর একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ পর্যন্ত বিদ্যালয়টি রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিলে আজ আমাদের এই করুণ দৃশ্য দেখতে হতো না। এর দায় সংশ্লিষ্টদের কেউই এড়াতে পারবেন না।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, গতকালও স্কুলে ক্লাস হয়েছে। ভোরে শুনলাম এ অবস্থা। সঙ্গে সঙ্গে এটিও স্যারকে জানাই। তিনি এসেছেন। পরামর্শ করে ১৪ জন শ্রমিক লাগিয়ে দিয়েছি। তারা বিদ্যালয়ের জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। এরপরও ইতোমধ্যে একটি বেড়া ও ৩টি জানালা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, মন্ত্রী, এমপি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ডিসি ও ইউএনও স্যার সবাই এসেছিলেন। কিন্তু শুধুই আশ্বাস পেয়েছি। একটা জিও ব্যাগের বস্তাও এই স্কুল এলাকায় ফেলা হয়নি। ফেললে হয়তো আজ এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে হতো না।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুকুল চন্দ্র বর্মন বলেন, নদীভাঙন শুরুর পর থেকে যখন যা হয়েছে, বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে। কিন্তু তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি। সে কারণেই আজ এই ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইফফাত জাহান তুলি বলেন, নতুন করে আবারও ভাঙ্গন শুরু হয়েছে বলে শুনেছি। প্রতিষ্ঠানটি অন্য স্থানে সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, নদীভাঙ্গনের ওপর কারও হাত নেই। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো গাফিলতি আছে কি না, সে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম জানান, খবর পাওয়ামাত্রই ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। আশা করছি আজকের মধ্যেই জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হবে।



