logo

চুরির অপবাদে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন

চুরির অপবাদে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন

শরীয়তপুরের ডামুড্যায় মাছ চুরির অপবাদ দিয়ে সেলিম পাইক নামের এক যুবককে হাত বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে ঘেরের মালিক শাহীন মাতবর ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে। নির্যাতনের দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) ভোরে উপজেলার কনেশ্বর ইউনিয়নের ইকুরি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকার দরিদ্র যুবক সেলিম পাইক ঘেরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তাকে মাছ চোর সন্দেহে ধাওয়া ঘেরের করেন কয়েকজন কর্মচারী। একপর্যায়ে তিনি পানিতে ঝাঁপ দিলে সেখান থেকে তুলে এনে মারধর করা হয়। পরে তাকে একটি ঘরে বেঁধে রাখা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, পরে ঘেরের মালিক শাহীন মাদবর এসে হাত রশি দিয়ে পেছনে বেঁধে মাটিতে ফেলে বাঁশের লাঠি দিয়ে সেলিমের পায়ে আঘাত করতে থাকেন। এ সময় সেলিম নিজেকে নির্দোষ দাবি করে চিৎকার করলেও তিনি থামেননি। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে এনে ফেলে রেখে যায় শাহীন মাদবরের লোকজন।

মারধরে সেলিমের ডান পা ভেঙে গেছে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। প্রাথমিকভাবে কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়নি। পরে গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতায় চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৪৩ সেকেন্ডের এক ভিডিওতে দেখা যায়, দুই ব্যক্তি সেলিমকে টেনে ঘেরের পাড়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আরেক ব্যক্তি তার হাত চেপে ধরেন, আর দুজন মিলে গাছের ডাল দিয়ে পেটাচ্ছেন। এ সময় সেলিম ‘বাবারে, বাবারে’ বলে চিৎকার করেন। 

১৮ সেকেন্ডের অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সেলিমের হাত বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে এবং একজন মোটা বাঁশ দিয়ে পায়ে আঘাত করছেন। পাশে কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছেন।

সেলিমের ভাই জয়নাল আবেদীন বলেন, সেলিম কোনো চুরি করেননি। যদি চুরি করত, তার হাতে মাছ থাকত। তিনি কিছুটা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীর মতো। তাকে অমানুষিকভাবে মারধর করা হয়েছে। আমরা বিচার চাই।

স্থানীয় আখতার হোসেন বলেন, সেলিম অত্যন্ত গরিব। তার বাবা নেই, মা অন্যত্র থাকেন। একটি খুপরি ঘরে মানুষের রান্নাঘরে ঘুমান। তাকে চোর সাব্যস্ত করে মেরে পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অপরাধী হলেও আইন আছে। এভাবে নির্যাতনের অধিকার কারও নেই।

ভুক্তভোগী সেলিম পাইক বলেন, আমি মাছ চুরির বিষয়ে কিছুই জানি না। ঘেরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে ধরে মারধর করা হয়েছে। আমার পা ভেঙে গেছে। পরে আমাকে ফেলে রেখে চলে গেছে।

অভিযুক্ত শাহীন মাদবর বলেন, ওরা কয়েকজন আমার ঘেরের মাছ চুরি করেছে। আমার লোকজন তাকে ধরেছে। পরে মারধর হয়েছে।

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা মারতে পারি না। জিদের মাথায় মেরে ফেলেছি।’

এ ঘটনাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন শরীয়তপুরের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদুর রহমান। তিনি বলেন, ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে- একজনকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। কেউ অপরাধী হলেও তাকে আইনের হাতে তুলে দিতে হবে। এভাবে নির্যাতন গ্রহণযোগ্য নয়। জড়িতদের বিচার হওয়া জরুরি।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গোসাইরহাট সার্কেল) শামসুল আরেফীন বলেন, আমরা ভিডিওটি দেখেছি। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্তসাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।