
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হজরত খানজাহান আলীর (রহ.) মাজার-সংলগ্ন দিঘি থেকে কুমির ‘ধলা পাহাড়’ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন মাজারের খাদেম, স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের একটি বড় অংশ। তাদের দাবি, কুমিরটি শুধু একটি প্রাণী নয়, বরং মাজারের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও দর্শনার্থীদের আকর্ষণের অন্যতম অংশ।
সম্প্রতি কুমিরের আক্রমণে এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনার পর জননিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসনের সিদ্ধান্তে কুমিরটিকে দিঘি থেকে সরিয়ে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়। তবে এ সিদ্ধান্তের পর মাজার এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
মাজারের খাদেম তপু ফকির বলেন, ‘ও হচ্ছে মাদি কুমির। আমরা ওকে ধলা পাহাড় বলে ডাকি। ডাকলেই সে ঘাটের কাছে চলে আসে। এই কুমিরের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের এক ধরনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মাজারে আসেন। কেউ মানত করেন, আবার কেউ কুমিরকে খাওয়ানোর জন্য মুরগি নিয়ে আসেন। ধলা পাহাড় শুধু একটি প্রাণী নয়, এটি এই মাজারের ঐতিহ্য ও আকর্ষণের অংশ। তাই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে তাকে আবার মাজারের দিঘিতে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই।’
তিনি বলেন, বর্তমানে যে কুমিরটিকে সবাই ‘ধলা পাহাড়’ নামে চেনে, সেটি মূল ঐতিহাসিক ধলা পাহাড় বা কালা পাহাড় নয়। ২০০৫ সালে ভারত থেকে আনা ছয়টি কুমিরের মধ্যে এটিই ছিল শেষ জীবিত সদস্য। ২০২৩ সালে কালা পাহাড় মারা যাওয়ার পর থেকে ধলা পাহাড়ই দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়।
খান জাহান আলী মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তরিকুল ইসলাম বলেন, শিশু মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং আমরা গভীরভাবে শোকাহত। মানুষের নিরাপত্তা অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে। তবে একই সঙ্গে মাজারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও ইতিহাসও সংরক্ষণ করা জরুরি। যদি আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, শক্ত লোহার বেষ্টনী, নির্দিষ্ট সংরক্ষিত এলাকা এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির মাধ্যমে কুমিরটিকে নিরাপদ পরিবেশে রাখা যায়, তাহলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, শত শত বছর ধরে এই মাজারের সঙ্গে কুমিরের একটি ঐতিহ্যগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ শুধু মাজার জিয়ারত করতেই নয়, কুমির দেখার আগ্রহ নিয়েও এখানে আসেন। কুমিরটি মাজারের অন্যতম আকর্ষণ ছিল। কুমির না থাকলে স্বাভাবিকভাবেই দর্শনার্থীর সংখ্যা কিছুটা কমে যেতে পারে, যা মাজারকেন্দ্রিক ঐতিহ্য ও পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলবে।
মাজারের খাদেম জামাল ফকির বলেন, ধলা পাহাড় এই মাজারের বহু বছরের ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অংশ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ মাজার জিয়ারতের পাশাপাশি কুমিরটি দেখতেও আসতেন। সাম্প্রতিক ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক, তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করে কুমিরটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া যেত। আমরা চাই মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক, সেই সঙ্গে মাজারের ঐতিহ্যও অক্ষুণ্ন থাকুক।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ মাজারে এসে কুমির দেখতেন। অনেকেই মানত পূরণের অংশ হিসেবে মুরগি নিয়ে এসে কুমিরকে খাওয়াতেন। ফলে কুমিরটি শুধু দর্শনীয় প্রাণী নয়, মাজারকেন্দ্রিক লোকজ সংস্কৃতি ও বিশ্বাসেরও একটি অংশ হয়ে উঠেছিল।
ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী পাপ্পু শেখ বলেন, শিশু মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এমন দুর্ঘটনা আর যেন না ঘটে, সেটাই সবার চাওয়া। কুমির থাকুক, তবে অবশ্যই নিরাপদ ব্যবস্থার মধ্যে।
স্থানীয় বাসিন্দা মুন্না শেখ বলেন, কুমির এই মাজারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ। আমরা চাই না ঐতিহ্য হারিয়ে যাক। আবার মানুষের জীবনের ঝুঁকিও থাকতে পারে না। তাই শক্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ও নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে কুমিরকে সংরক্ষণ করা হোক। কুমিরও থাকুক, মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত থাকুক।
দর্শনার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মাজারে কুমির দেখাটা আলাদা এক আকর্ষণ ছিল। শিশু মৃত্যুর ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক, তবে এর সমাধান কুমির সরিয়ে দেওয়া নয়। আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নির্দিষ্ট সংরক্ষিত এলাকায় রাখলে কুমিরও থাকবে, দর্শনার্থীরাও নিরাপদে মাজারে আসতে পারবেন। আমরা চাই কুমিরও থাকুক, নিরাপত্তাও থাকুক।
তবে কুমির সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগতও জানিয়েছেন অনেক দর্শনার্থী। মাগুরা থেকে আসা সাদিকুল ইসলাম বলেন, আগে দিঘির ঘাটে নামতে একটু ভয় লাগত। বিশেষ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে এলে শিশুদের নিয়ে সব সময় চিন্তায় থাকতে হতো। কুমির সরিয়ে নেওয়ার পর এখন অনেকটাই স্বস্তি নিয়ে গোসল করতে পারছি। নিরাপত্তার বিষয়টি সবার আগে বিবেচনা করা উচিত।
স্থানীয়দের একটি বড় অংশের মত, দিঘির চারপাশে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, লোহার বেষ্টনী, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা নিয়ে কুমিরটিকে পুনরায় মাজারে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন ঐতিহ্য সংরক্ষিত হবে, অন্যদিকে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এদিকে বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কুমিরটি বর্তমানে সুস্থ রয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভবিষ্যতে এর স্থায়ী আবাসস্থল নির্ধারণ করা হবে।

