লোকসানে একে একে বন্ধ নারকেল তেলের কারখানা, কর্মহীন হাজারো শ্রমিক

বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরীর নারকেল তেল শিল্প কাঁচামালের ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভারী যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরে গেছে। ৪০টির বেশি মিলের মধ্যে কয়েকটি সচল থাকলেও অধিকাংশই লোকসানজনিত বন্ধের উপক্রম। এতে হাজারো শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়ে ভিন্ন পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েকটি কারখানায় সীমিত পরিসরে কাজ চললেও অধিকাংশ মিলেই নীরবতা। কোথাও দুই-একজন শ্রমিক কাজ করছেন, আবার কোথাও তালাবদ্ধ গেট। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তাহীনতা।
১৯৯৬ সালে শহরের ভৈরব নদের তীরে প্রায় ১৯ দশমিক ৩০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরী। এখানে ১১৯টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। বর্তমানে ৫২টি শিল্পকারখানা গড়ে উঠলেও বেশিরভাগই উৎপাদন সংকটে।
সংকটের নেপথ্যে কী
সংশ্লিষ্টরা জানান, দুই দশক আগেও এই শিল্পনগরীতে ছিল ভিন্ন দৃশ্য। ভোর হলেই কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠত পুরো শিল্পনগরী। শ্রমিকদের ব্যস্ততায় সরগরম থাকত কারখানাগুলো। নারকেল প্রক্রিয়াজাত শিল্পে দুই হাজারের বেশি নারী-পুরুষ শ্রমিক কাজ করতেন। প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ টন তেল উৎপাদিত হতো। জেলার চাহিদা মিটিয়ে এসব তেল পাঠানো হতো দেশের বিভিন্ন এলাকায়।
২০০৬ সালের পর বাজারে মোড়কজাত তেলের ব্যাপক বিস্তারে কমতে থাকে খোলা নারকেল তেলের চাহিদা। একই সময়ে নারকেল উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ডাবের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় কাঁচামালের সংকট তীব্র হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুপেয় পানির ঘাটতি, ভাঙাচোরা সড়ক, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা।
শ্রমিক বিষু কুমার দাস এশিয়া পোস্টকে বলেন, আগে একটি মিলেই ৩০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। এখন একটি মেশিন কোনোমতে চালু রাখা হয়। অধিকাংশ সময় মিল বন্ধ থাকায় বাইরে দিনমজুরি করতে হয়, তাও নিয়মিত কাজ মেলে না। মিল বন্ধ থাকায় অনেক সময় পরিবার নিয়ে কষ্টে দিন কাটাতে হয়।
কোকোনাট অয়েল মিল মালিক হাজী আল আমিন বলেন, গত পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ নারকেল পাওয়া যাচ্ছে না। মিল চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কখনও দুই-তিন মাস পর কাঁচামাল পেলে সাময়িকভাবে উৎপাদন শুরু করা হয়, পরে আবার বন্ধ হয়ে যায়। বাইরে থেকে নারিকেল আনতে গেলে খরচ বেড়ে যায়; যা ব্যবসা টিকিয়ে রাখা আরও কঠিন করে তোলে।
আরেক মিল মালিক সাগর বলেন, শিল্পনগরীতে দীর্ঘদিন ধরে পানির সংকট চলছে। আগে একটি পুকুর থেকে সরবরাহের ব্যবস্থা থাকলেও এখন সেই লাইন নষ্ট হয়ে গেছে। খাবার ও ব্যবহারযোগ্য পানির অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
ব্যবসায়ী সৈকত বলেন, কিছু সড়কের কাজ হলেও বেশ কয়েকটি রাস্তা এখনো জরাজীর্ণ। বর্ষাকালে হাঁটু সমান পানি জমে যায়। অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হলে শিল্পনগরীর ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়বে।
কর্তৃপক্ষ যা বলছে
বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরীর উপব্যবস্থাপক মো. শরীফ সরদার বলেন, নারকেল সংকটের কারণে কয়েকটি কারখানা বন্ধ থাকলেও অবকাঠামোগত উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে রাস্তা ও ড্রেনের বাকি সংস্কার শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সুপেয় পানির সংকট নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। দ্রুত সাবমারসিবল পাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিল্পনগরীতে বাউন্ডারি ওয়াল না থাকায় কিছু নিরাপত্তা সমস্যা থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে।