ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে পর্যটন অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর আশা

কক্সবাজারে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পবিত্র রমজানের কারণে টানা দেড় মাসের মন্দা কাটিয়ে পর্যটন খাত এখন ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায়। আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটিকে ঘিরে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তাদের প্রত্যাশা, এই সময়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে।
পর্যটন খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, গত দেড় মাসে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ছিল প্রায় পর্যটকশূন্য। রমজান মাসে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ছাড় দিয়েও হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউসগুলোতে প্রত্যাশিত পর্যটক পাওয়া যায়নি। এতে হোটেল-রেস্তোরাঁর পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফটোগ্রাফার, জেটস্কি চালক, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা ক্ষতির মুখে পড়েন।
তবে ঈদের ছুটিতে পরিস্থিতি বদলাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাত দিনের ছুটিতে ৭ থেকে ১০ লাখ পর্যটক কক্সবাজারে ভিড় করতে পারেন। এতে চাঙ্গা হবে পর্যটন অর্থনীতি এবং সাম্প্রতিক ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
ইতোমধ্যে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কক্ষ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। ঈদকে সামনে রেখে চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারকাজ। তারকা মানের হোটেলগুলোতেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি।
সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি ইনানী, হিমছড়ি, মহেশখালী, সোনাদিয়া, কুতুবদিয়া, ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক এবং রামুর বৌদ্ধ মন্দিরেও পর্যটকের চাপ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিধিনিষেধের কারণে সেন্ট মার্টিনে ভ্রমণ এখনও বন্ধ রয়েছে।
৫০০ কোটি টাকার বাণিজ্যের প্রত্যাশা
হোটেল-মোটেল মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ঈদুল ফিতরে কক্সবাজারে প্রায় ৯ লাখ ৭০ হাজার পর্যটক এসেছিলেন। এবার পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকায় সেই সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
৫ শতাধিক হোটেল ও রিসোর্টের দৈনিক ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার। ঈদের ছুটি ২৩ মার্চ পর্যন্ত হলেও অনেক হোটেলে ৩০ মার্চ পর্যন্ত অগ্রিম বুকিং রয়েছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট ১৩টি খাতে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার লেনদেন হতে পারে। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত ভাড়া বা মূল্য আদায় রোধে প্রশাসনের নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আশার আলো
পর্যটকের ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ঈদকে ঘিরে নতুন করে আশাবাদী। লাবণী ও সুগন্ধা পয়েন্টে প্রায় ৩০০ ফটোগ্রাফার কাজ করেন, আর পুরো সৈকত এলাকায় রয়েছেন প্রায় এক হাজার। পর্যটক না থাকায় তারা আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন।
ফটোগ্রাফার আবদুস সবুর বলেন, অন্যান্য বছরের ঈদে সপ্তাহে ১০-১২ হাজার টাকা আয় হলেও এবার রমজানে আয় ছিল খুবই কম। ঈদে পরিস্থিতি ভালো হবে বলে আশা করছেন তিনি।
একইভাবে বিচ বাইক চালক, কিটকট বিক্রেতা, শুটকি ব্যবসায়ী ও জীপচালকেরাও ঈদ মৌসুমে ভালো আয়ের প্রত্যাশা করছেন।
তিন স্তরের নিরাপত্তা, সমুদ্রে নামতে সতর্কতা
এদিকে ঈদ মৌসুমে সমুদ্রে গোসলে নেমে দুর্ঘটনা ঠেকাতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন লাইফগার্ড কর্মীরা। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে ২৭ জন লাইফগার্ড কর্মী সার্বক্ষণিক নজরদারি করছেন। ঈদ উপলক্ষে আরও ১৫ জন স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা।
জানতে চাইলে সি-সেইফ লাইফগার্ডের সিনিয়র কর্মকর্তা মো. ফারুক বলেন, অনেক সময় পর্যটকেরা লাল পতাকার বাইরে গিয়ে ঝুঁকি নেন। আমরা আশা করছি, যারা কক্সবাজারে ঘুরতে আসবেন তারা লাইফগার্ড কর্মীদের নির্দেশনা মেনে চলবেন। তবে পুরো ১২০ কিলোমিটার সৈকত নজরদারি করা সম্ভব নয়।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের মুখপাত্র পরিদর্শক পারভেজ আহমদ বলেন, যেহেতু ঈদে পর্যটক বাড়বে, সে কারণে আমরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছি। ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে টহল টিম, মোবাইল টিম ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা টিম মাঠে থাকবে। পর্যটকদের সঙ্গে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য আমরা সজাগ আছি।
সার্বিক বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, ঈদের ছুটিতে পর্যটন ব্যবসা জমজমাট হলে আবারও প্রাণ ফিরে পাবে কক্সবাজার। পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত হোটেল ভাড়া আদায় বা রেস্তোরাঁয় খাবারের দাম বাড়ানো রোধে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে থাকবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।