পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স পাস, পা দিয়েই চলে সংসারের কাজ

জন্মের পর দুই হাত না থাকায় অনেকেই তখন তার বেঁচে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কেউ বলেছে, এই মেয়েকে বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই। কিন্তু সব প্রতিকূলতা ও কটুকথাকে উপেক্ষা করে মেয়েকে বুকে আগলে রাখেন মা সাজেদা বেগম। সেই সন্তান আজ এক অদম্য সংগ্রামের প্রতীক। মেধা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে পা দিয়ে লিখেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স (স্নাতকোত্তর) সম্পন্ন করেছেন তিনি। গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কচুয়া গ্রামের আয়েশা আক্তার এখন আর কারও দয়া বা সাহায্য চান না, বরং নিজের যোগ্যতায় একটি স্থায়ী কর্মসংস্থান চান। আয়েশার এই মানবিক দৃষ্টান্তের পর তার পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
সরেজমিন দেখা যায়, দুই হাত না থাকলেও আয়েশা নিজের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব কাজই পা দিয়ে করছেন। কখনও পায়ের আঙুলে চাল ঝাড়ছেন, কখনও তরকারি কাটছেন, আবার কখনও পা দিয়েই খাতায় লিখছেন। সংসারের ছোট-বড় সব কাজেই তিনি স্বাভাবিকভাবে করছেন। এভাবে সংসারের কাজের পাশাপাশি সাঘাটার কচুয়াহাট শহীদ এইচ আর এম উচ্চ দিব্যালয় থেকে মানবিক শাখায় ২০১৪ সালে এসএসসি ও উদায়ন মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং একই কলেজ থেকে ডিগ্রি (বিএ) পাস করেন। পরে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করা আয়েশা। ছোটবেলা থেকেই তিনি পা দিয়ে লেখালেখি শিখেছেন। অন্য শিশুরা যখন হাতে কলম ধরতে শেখে, তখন তিনি পায়ের আঙুলে কলম ধরে খাতা ভরেছেন অক্ষরে অক্ষরে। কঠিন এই পথচলায় প্রতিটি ধাপই ছিল তার জন্য একেকটি সংগ্রামের গল্প।

আয়েশা কচুয়া গ্রামের মৃত আব্দুল লতিফের মেয়ে। প্রায় দেড় বছর আগে তিনি বাবাকে হারান। বর্তমানে তার মা সাজেদা বেগমই পরিবারের একমাত্র ভরসা। চার বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়।
আয়েশার মা সাজেদা বেগম বলেন, জন্মের পর অনেক মানুষ অনেক কথা বলেছে। কেউ বলেছে, এই মেয়েকে বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই। কিন্তু আমি কখনও আমার মেয়েকে অভিশাপ মনে করিনি। আল্লাহ যেভাবে দিয়েছেন, সেভাবেই মানুষ করার চেষ্টা করেছি। আজ সে পা দিয়ে লেখাপড়া করে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছে, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।
আয়েশার চাচা জহুরুল ইসলাম বলেন, মেয়েটা অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করেছে। জন্মগতভাবে দুই হাত না থাকলেও কখনও হাল ছাড়েনি। আমরা চাই তার একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হোক। সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তার যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির সুযোগ দিত, তাহলে সে সম্মানের সঙ্গে নিজের জীবন চালাতে পারত।
প্রতিবেশী বিলা বেগম বলেন, অনেকেই আসে, ভিডিও করে নিয়ে যায়, ছবি তুলে নিয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে মেয়েটার জন্য তেমন কেউ কিছু করে না। অথচ আয়েশা পা দিয়েই সংসারের সব কাজ করে রান্না, তরকারি কাটা, ঘর ঝাড়ু দেওয়া, বিছানা গোছানোসহ সব কাজই সে নিজেই সামলায়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আয়েশা আক্তার বলেন, আমি অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি। আমি ভিক্ষা চাই না, আমি আমার যোগ্যতায় একটা চাকরি চাই। সরকার যদি আমার মতো অসহায় শিক্ষিত মানুষের দিকে একটু নজর দিত, তাহলে আমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মায়ের পাশে থাকতে পারতাম।
তিনি আরও বলেন, মানুষ দান-সদকা করে, সাহায্য করে। কিন্তু আমার মতো একজন শিক্ষিত মানুষের জন্য যদি একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতো, সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সহায়তা হতো।

সাঘাটা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার আজহার আলী জানান, আয়েশার জীবন কেবল একজন প্রতিবন্ধী নারীর গল্প নয়, এটি ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য ও অদম্য সাহসের এক অসাধারণ মানবিক দৃষ্টান্ত। তারা মনে করেন, রাষ্ট্র ও সমাজের সহযোগিতা পেলে তিনি শুধু নিজের জীবনই বদলাতে পারবেন না, বরং অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠবেন। যে শিশুর বেঁচে থাকা নিয়েই একদিন প্রশ্ন তুলেছিল সমাজের কিছু মানুষ, আজ সেই আয়েশা প্রমাণ করেছেন মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মনোবল, সাহস এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
সাঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন সুইট বলেন, আয়েশার বিষয়টি সত্যিই মানবিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক। তার মতো একজন মেধাবী ও সংগ্রামী মেয়ের পাশে সমাজের সবাইকে দাঁড়ানো উচিত। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা বিষয়টি বিবেচনায় রাখব এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার চেষ্টা করব।
সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল কবীর জানান, আয়েশা আক্তারের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে আমরা ঈদের সময় তার সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছি। সরকারি পক্ষ থেকে ঈদ উপলক্ষে তাকে কিছু সহায়তাও প্রদান করা হয়েছে।
ইউএনও আরও বলেন, আয়েশা অত্যন্ত মেধাবী ও সংগ্রামী একজন মানুষ। তার জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি তাকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
