logo

সূর্যমুখী কমাতে পারে দেশের ভোজ্যতেলের আমদানি

সূর্যমুখী কমাতে পারে দেশের ভোজ্যতেলের আমদানি
ছবি : এশিয়া পোস্ট

বরগুনায় সূর্যমুখী চাষের সম্ভাবনা ব্যাপক। তবে নানা প্রতিবন্ধকতায় এ ফসলের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকেরা। গত তিন বছর ধরে জেলায় ধারাবাহিকভাবে কমছে সূর্যমুখীর আবাদ। যদিও এখনও দেশের মধ্যে সূর্যমুখী চাষে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বরগুনা।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সূর্যমুখীর আবাদ বাড়ানো গেলে ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ এ তেল মানুষের সুস্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কৃষকদের ভাষ্য, সরকার পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে উপকূলীয় লবণসহিষ্ণু জমিতে সূর্যমুখী চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

একসময় বরগুনায় দ্রুত বাড়ছিল সূর্যমুখীর আবাদ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২১ সালে জেলায় ২ হাজার ২৭২ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছিল। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার হেক্টরে। একই সময়ে উৎপাদন বেড়ে হয় ৮ হাজার ৫৯ টন।

তবে এরপর থেকেই কমতে শুরু করে আবাদ ও উৎপাদন। চলতি বছরে সূর্যমুখীর আবাদ নেমে এসেছে ৩ হাজার ২০২ হেক্টরে।

কৃষকদের অভিযোগ, ফলন ভালো হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, বাজারজাতকরণে সংকট, মানসম্মত বীজের অভাব এবং মাড়াইযন্ত্র না থাকায় তারা সূর্যমুখী চাষ থেকে সরে যাচ্ছেন।

তালতলীর কৃষক নাঈম হোসেন বলেন, ফলন ভালো হলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য পাইনি। সরকার যদি সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করত, তাহলে আমরা লাভবান হতাম।

আরেক কৃষক আব্দুর রব বলেন, সূর্যমুখীর ফুল থেকে বীজ আলাদা করা খুব কষ্টের। ভর্তুকিতে মাড়াইযন্ত্র পেলে আবার চাষ করতাম।

ঠংপাড়ার কৃষক বায়জিদ বলেন, ভালো মানের বীজ না পাওয়ায় ফলন খারাপ হয়েছে। মানসম্মত বীজ নিশ্চিত করা গেলে আবার চাষে ফিরব।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বরগুনার ৯ হাজার ২৪৪ জন কৃষক ২ হাজার ২৭২ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ করেন। সে বছর উৎপাদন হয় ৩ হাজার ৪৮০ টন।

২০২২ সালে আবাদ বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৫৩ হেক্টরে। উৎপাদন হয় ৪ হাজার ১৭১ টন।

২০২৩ সালে জেলায় রেকর্ড পরিমাণ ৪ হাজার হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়। উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৫৯ টনে।

তবে ২০২৪ সালে আবাদ কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৮৫ হেক্টরে এবং উৎপাদন হয় ৬ হাজার ৫২৯ টন। ২০২৫ সালে আবাদ আরও কমে ৩ হাজার ৩৭৬ হেক্টরে নেমে আসে। উৎপাদন হয় ৬ হাজার ২৪৬ টন। চলতি বছরে আবাদ নেমেছে ৩ হাজার ২০২ হেক্টরে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখী অত্যন্ত উপযোগী ফসল। তুলনামূলক কম খরচ, কম সেচ ও কম রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে এটি পরিবেশবান্ধব এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।

প্রতি বিঘা জমিতে সূর্যমুখীর বীজ উৎপাদন হয় ১৪ থেকে ১৫ মণ। প্রতি মণ বীজ থেকে পাওয়া যায় ১৪ থেকে ১৬ কেজি তেল। সেই হিসাবে এক বিঘা জমি থেকে প্রায় ২২৪ কেজি তেল উৎপাদন সম্ভব।

অন্যদিকে সরিষায় প্রতি বিঘায় গড়ে ১৬০ কেজি তেল পাওয়া যায়। অর্থাৎ সূর্যমুখী থেকে তুলনামূলক বেশি তেল উৎপাদন সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলীয় এলাকায় সূর্যমুখীর আবাদ বাড়ানো গেলে দেশের ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উৎপাদিত বীজ বিক্রির জন্য স্থায়ী বাজার নেই। পাইকারেরা অনেক সময় বীজ কিনতে চান না, আবার কিনলেও ন্যায্যমূল্য দেন না।

এ ছাড়া সূর্যমুখীর ফুল থেকে বীজ আলাদা করার যন্ত্র স্থানীয় বাজারে সহজলভ্য নয়। অনেক কৃষকের পক্ষে এসব যন্ত্র কেনাও সম্ভব নয়।

কৃষকদের অভিযোগ, বিদেশ থেকে আমদানি করা কিছু বীজের মান ভালো না হওয়ায় ফলন কম হয়েছে। এতে অনেকেই লোকসানের মুখে পড়েছেন।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচারাল বোটানি বিভাগের অধ্যাপক মো. আবুল কাইয়ুম বলেন, সরকার সূর্যমুখীর উৎপাদন বাড়াতে কিছু প্রকল্প নিলেও অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয় না।

তিনি বলেন, উপকূলীয় লবণাক্ত জমিতে ব্যাপকভাবে সূর্যমুখী চাষের সুযোগ রয়েছে। এতে পতিত জমিও চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, সূর্যমুখীর সুফল নিয়ে কৃষক ও ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকদের উৎপাদিত বীজের বাজারজাতকরণ সহজ করতে হবে।

তার মতে, নিম্নমানের বীজ, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং কৃষকদের কাছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না পৌঁছানোই চাষ কমে যাওয়ার বড় কারণ।

বরগুনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, কিছুটা আবাদ কমলেও বরগুনা এখনও সূর্যমুখী চাষে দেশের শীর্ষে রয়েছে।

তিনি জানান, কৃষকদের বিনামূল্যে উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি চাষ বাড়াতে বিভিন্ন পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, তালতলীতে ভর্তুকিতে একটি তেল উৎপাদন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয়ভাবে সূর্যমুখীর বীজ থেকে তেল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ সহজ হবে। কৃষকদের মধ্যে মাড়াইযন্ত্র সরবরাহের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।