logo
Advertisement

পাহাড়ের দুর্গম জনপদে পানির সংকট কাটাচ্ছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ,বান্দরবান
পাহাড়ের দুর্গম জনপদে পানির সংকট কাটাচ্ছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের বসানো গভীর নলকূপ থেকে পানি নেয় পাহাড়ের দুর্গম পাড়ার নারীরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পাহাড়ের দুর্গম পাড়ায় সুপেয় পানির সংকট ছিল দীর্ঘদিনের নিত্যসঙ্গী। খাবার পানি সংগ্রহ করতে কখনো এক থেকে তিন কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হতো, আবার কোথাও পাহাড়ের চূড়া থেকে শত শত ফুট নিচে নেমে ঝিরি, ছড়া কিংবা ঝরনা থেকে পানি আনতে হতো। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হতেন নারী ও শিশুরা।

Advertisement

তবে সেই চিত্র এখন বদলাতে শুরু করেছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে গভীর নলকূপ, গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস), রিংওয়েল ও রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। এতে জেলার অন্তত ৫০টি পাড়ার বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের পানির কষ্ট অনেকটাই কমেছে।

বান্দরবান সদর উপজেলার কয়েকটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাড়ির কাছেই স্থাপন করা পানির কল থেকে পানি সংগ্রহ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কেউ গোসল ও কাপড় ধোয়ার পর কলসি ভরে পানি নিয়ে ফিরছেন, আবার কেউ রান্না ও দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য পানি সংগ্রহ করছেন।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বাসিন্দাদের সুবিধার জন্য বাড়ির কাছেই স্থাপন করা হয় পানির টিউবয়েল। ছবি: এশিয়া পোস্ট
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বাসিন্দাদের সুবিধার জন্য বাড়ির কাছেই স্থাপন করা হয় পানির টিউবয়েল। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বান্দরবান শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরের টিএনটি মারমাপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, ৬০ বছর বয়সি মাচিং মারমা বাড়ির পাশের কল থেকে পানি সংগ্রহ করছেন। তিনি জানান, এক বছর আগেও পানি সংগ্রহের জন্য তাকে প্রায় ৮০০ ফুট নিচে পাহাড়ি পথে যেতে হতো। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই কাজ তার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। তার ওপর ঝিরি বা ছড়া থেকে পাওয়া পানিও অনেক সময় ময়লা ও কাদাযুক্ত থাকত।

পাড়ার কারবারি অংবাই মারমা জানান, পানি ছিল তাদের এলাকার অন্যতম বড় সমস্যা। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের গভীর নলকূপ ও পাইপলাইনের মাধ্যমে এখন পাহাড়ি-বাঙালি মিলিয়ে প্রায় ৮০টি পরিবার পানির সুবিধা পাচ্ছে।

বান্দরবান মেঘলা এলাকার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন ও কনক চাকমা বলেন, আগে পানি সংগ্রহের জন্য অনেক দূরে যেতে হতো। এখন সেই কষ্ট অনেকটাই কমে গেছে। তারা বলেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের করা দেওয়া গভীর নলকূপের মাধ্যমে এখন খুব সহজেই ঘরের নিত্যদিনের ব্যবহারের পানি পাচ্ছি।

বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নয়নে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর আওতায় ১২টি পুরোনো জিএফএস মেরামত, নতুন ১০টি জিএফএস নির্মাণ, ৫৮৩টি রিংওয়েল, ১৪০টি রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম, ৫০টি গভীর নলকূপ এবং পাড়াভিত্তিক পানি সরবরাহের জন্য ৫০টি প্রোডাকশন টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে ৩০টি স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার।

বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাইদুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলার অন্তত ৫০টি পাড়ায় নিরাপদ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বান্দরবান বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে এশিয়া পোস্টকে বলেন, প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে জেলার দুর্গম এলাকায় পুরোনো জিএফএস সংস্কারের পাশাপাশি নতুন জিএফএস, রিংওয়েল, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম, গভীর নলকূপ ও পাড়াভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরাসরি অন্তত ৫০টি পাড়ার মানুষ উপকৃত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, টানা বৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বন্যার কারণে কিছু স্থাপনার প্লাস্টার ও রঙের কাজ বাকি রয়েছে। তবে প্রকল্পের মূল কার্যক্রম ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহের এই উদ্যোগ শুধু পানির সংকটই কমাচ্ছে না, একই সঙ্গে নারী ও শিশুদের শ্রম ও সময় বাঁচানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতেও ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।