Advertisement

মেহেরপুরে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ ফাঁদ, আদালতে গিয়ে জানলেন বিয়েই হয়নি

খান মাহমুদ আল রাফি, মেহেরপুর
মেহেরপুরে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ ফাঁদ, আদালতে গিয়ে জানলেন বিয়েই হয়নি
মেহেরপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালত। ছবি: এশিয়া পোস্ট

প্রেমের সম্পর্ক বা পরিবারের অমতে বিয়ে করতে চাওয়া অনেক তরুণ-তরুণী নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে গিয়ে জালিয়াতি চক্রের খপ্পরে পড়ছেন। ১৫০ বা ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি এফিডেভিটে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়ে তাদের বোঝানো হচ্ছে—‘কোর্ট ম্যারেজ’ সম্পন্ন হয়েছে, এখন আর কোনো আইনি ভয় নেই। অথচ কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছর পর দাম্পত্যে বিরোধ, প্রতারণা অথবা বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটলে আদালতে গিয়ে তারা জানতে পারছেন এটি কোনো বিবাহই নয়।

Advertisement

মেহেরপুর জেলায় বিগত কয়েক মাস ধরে পরিচালিত বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন শতাধিক নথি, তথ্য ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার বিবরণ। শুধু কোর্ট ম্যারেজ নয়, নোটারি এফিডেভিটের অপব্যবহার, বাল্যবিবাহে এফিডেভিটের ব্যবহার, পরিচয় জালিয়াতি, বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে ভুয়া স্বাক্ষর এবং বিদেশি নাগরিককে ঘিরে বিতর্কিত নথি তৈরির মতো গুরুতর অনিয়ম সামনে এসেছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, মেহেরপুরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নোটারি এফিডেভিটকে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ বলে বাল্যবিবাহ, ভুয়া পরিচয় ও জাল স্বাক্ষর এমনকি সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ছাড়াই বিদেশি নাগরিকের বিয়ে বৈধ দেখানোর অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির জন্য এফিডেভিটের মাধ্যমে তালাকও সম্পাদন করা হচ্ছে। অথচ রাষ্ট্রীয় বা এমবেসির মাধ্যমে সনদ আদান-প্রদানের আইনি বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে অবৈধভাবে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

মেহেরপুরজুড়ে সক্রিয় এই চক্রটি সাধারণ মানুষের আইনি অজ্ঞতা ও আবেগকে পুঁজি করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া কিংবা পরিবারের অমতে বিয়ে করতে চাওয়া তরুণ-তরুণীদের লক্ষ্য করে তারা স্বল্পমূল্যের স্ট্যাম্পে হলফনামা তৈরি করে সেটিকেই ‘কোর্ট ম্যারেজ’ হিসেবে উপস্থাপন করছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ নামে স্বতন্ত্র কোনো বিয়ের বিধান নেই। মুসলিম বিবাহ ও বিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ এবং ২০০৯ সালের বিবাহ নীতিমালা অনুযায়ী মুসলিম বিয়ে অবশ্যই লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রারের (কাজী) মাধ্যমে নিবন্ধিত হতে হবে। নোটারি এফিডেভিট কেবল একটি হলফনামা বা ঘোষণাপত্র; এটি কোনোভাবেই কাবিননামা বা নিবন্ধিত বিয়ের বিকল্প নয়। ফলে শুধু এফিডেভিটের ওপর নির্ভর করে সংসার শুরু করলে পরবর্তীতে চরম আইনি জটিলতায় পড়তে হয়। বিশেষ করে নারীরা দেনমোহর, ভরণ-পোষণ, উত্তরাধিকার এবং দাম্পত্য অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মেহেরপুর পৌরসভার হালদারপাড়ার সাদিয়া আক্তার রুমী (পূর্বনাম পূজা) ও হীরক হকের বিবাহসংক্রান্ত এফিডেভিটে একাধিক গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে। নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিল রুমী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং একই দিন হীরক হকের সঙ্গে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এফিডেভিটে আরও বলা হয়, ওই সময় হীরক হক বিদেশে অবস্থান করছিলেন এবং ভিডিও কলে তাদের বিয়ে হয়। কিন্তু বিদেশে অবস্থান করলেও এফিডেভিটে হীরকের নামে স্বাক্ষর রয়েছে। আইন অনুযায়ী নোটারি পাবলিকের সামনে সশরীরে উপস্থিত না হয়ে এভাবে এফিডেভিটে স্বাক্ষর করার কোনো সুযোগ নেই।

এছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্রের নামের সঙ্গে অমিল ও নির্ধারিত ৩০০ টাকার পরিবর্তে ১৫০ টাকার স্ট্যাম্প ব্যবহারসহ বেশ কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। সংশ্লিষ্ট এফিডেভিটে আইনজীবী হিসেবে অ্যাডভোকেট নুরজামাল (জামান) এবং নোটারি পাবলিক হিসেবে অ্যাডভোকেট মেহেরুন নেসা (মনি) স্বাক্ষর ও সিলমোহর দিয়েছেন।

পরবর্তীতে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে মোহাম্মদ হীরক তার দ্বিতীয় স্ত্রী রুমীর সঙ্গে কিছুদিন সংসার করার পর প্রথম স্ত্রীর কাছে ফিরে যান এবং দ্বিতীয় স্ত্রীকে অস্বীকার করেন। বাধ্য হয়ে দ্বিতীয় স্ত্রী আদালতের দ্বারস্থ হন। বর্তমানে আমলী আদালতে দায়ের করা সি.আর. মামলাটি (নং ৬৯৪/২৬) বিচারাধীন।

সম্প্রতি মেহেরপুরে এক চীনা নাগরিক ও স্থানীয় এক তরুণীর বিয়েকে ঘিরেও একই অনিয়ম সামনে এসেছে। ওই দম্পতির উপস্থাপিত হলফনামায় ব্যবহৃত এক আইনজীবীর সিল ও স্বাক্ষর ভুয়া বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী। এছাড়া বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করার ক্ষেত্রে দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাধ্যতামূলক অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেওয়া হয়নি।

একইভাবে গাংনী উপজেলার বামুন্দি এলাকায় একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রী ও নবম শ্রেণির এক ছাত্র পালিয়ে গিয়ে জালিয়াতি চক্রের মাধ্যমে বয়স বাড়িয়ে নোটারি এফিডেভিট সম্পন্ন করে। পরে কুষ্টিয়ার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকেও একটি এফিডেভিট তৈরি করা হয়, যদিও দুজনই নাবালক। মেয়েটির বাবার আবেদনের প্রেক্ষিতে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে অভিভাবকদের জিম্মায় দেয়।

গাংনী উপজেলার এক ভুক্তভোগী অভিভাবক বলেন, আইন না জানার কারণে অন্যের কথায় বিশ্বাস করে নাবালিকা মেয়ের এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে দিয়েছিলাম। বলা হয়েছিল এটাই ‘কোর্ট ম্যারেজ’। দেড় বছর পর বিচ্ছেদ হলে জানতে পারি, বিয়ের কোনো নিবন্ধনই হয়নি। ফলে আমার মেয়ে দেনমোহর ও খোরপোষ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এখন ন্যায়বিচারের আশায় আদালতে মামলা লড়ছি।

মেহেরপুরের নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার রিজা আব্দুল মাবুদ বলেন, বিয়ে সম্পাদন বা তার বৈধতা ঘোষণা কোনো আইনজীবী বা নোটারি পাবলিকের এখতিয়ারভুক্ত নয়। এটি কেবল আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমেই সম্পন্ন হতে পারে। এ প্রবণতা রোধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও জনসচেতনতা জরুরি।

মেহেরপুরের জেলা রেজিস্ট্রার সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ নামে কোনো নিবন্ধিত বিবাহের বিধান নেই। একইভাবে বিদেশে অবস্থানকালে ভিডিও কলে বা এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে বা তালাক সম্পন্ন করারও সুযোগ আইনে নেই। ফলে এগুলো আইনি ভিত্তিহীন।

মেহেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আসাদুল আজম খোকন বলেন, নোটারি পাবলিকের সামনে সশরীরে উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও এফিডেভিট সম্পাদনের অভিযোগ আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী সমিতিতে আলোচনা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মেহেরপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিসি) তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদ বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং নোটারি এফিডেভিটের অপব্যবহার রোধে জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। কোনো অনিয়মের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া গেলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং কেবল নিবন্ধিত কাজীর মাধ্যমেই বিয়ে সম্পাদন করতে হবে।

উল্লেখ্য, মুসলিম বিবাহ ও বিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪-এর ৫ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। নিবন্ধন না করলে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

বিষয় :