বাবাকে পথ দেখাতে গিয়ে থমকে গেছে জিমের পড়াশোনা

চোখে আলো নেই প্রায় দুই যুগ ধরে। জীবনের সুদীর্ঘ এই সময়ে চারপাশের নিবিড় অন্ধকার তাকে স্পর্শ করলেও থামিয়ে দিতে পারেনি বেঁচে থাকার সংগ্রাম। কাঁধে কাঠের বাঁক, হাতে নিক্তি-বাটখারা, আর সামনে পথপ্রদর্শক হিসেবে ৯ বছরের শিশুসন্তান জিম—এই নিয়ে প্রতিদিন শহরের অলিগলি চষে বেড়ান দৃষ্টিহীন হাসিদুল ইসলাম। ভিক্ষাবৃত্তির কাছে মাথা নত না করে নিজের ঘাম ঝরানো শ্রমে দুই যুগ ধরে কুষ্টিয়া শহরে জীবিকা নির্বাহ করে চলেছেন এক অনন্য আত্মমর্যাদাশীল মানুষ।
সরেজমিনে কুষ্টিয়া শহরের হাউজিং এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক অনন্য দৃশ্য। হাসিদুলের কাঁধে কাঠের ভারী বাঁক, বাঁকের দুপাশের ঝুড়িতে স্তূপ করে রাখা পুরোনো কাগজ ও ভাঙারি মালামাল। আর সামনে ছোট ছোট পায়ে বাবাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার ছেলে জিম। কখনো ব্যস্ত সড়ক পার হতে বাবার হাত শক্ত করে ধরছে, কখনো-বা দূর থেকে চেনাচ্ছে অলিগলির পথ। দৃষ্টিহীন বাবার কাছে জিম যেন এক জীবন্ত ‘অন্ধের যষ্টি’। ছেলের চোখের আলোতেই যেন দুনিয়া দেখেন হাসিদুল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হাসিদুল ইসলামের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া গ্রামে। প্রতিদিন সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে পদ্মা নদী পার (ঘোড়ারঘাট) হয়ে তিনি কুষ্টিয়া শহরে আসেন। দিনভর অলিগলি ঘুরে গৃহস্থালি ও দোকানপাট থেকে টাকা দিয়ে কেনেন পুরোনো বই-খাতা, প্লাস্টিক ও অন্যান্য বাতিল মালামাল। দিনশেষে বড় বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে তা বিক্রি করে যা পান, তা দিয়েই চলে তার চার সদস্যের সংসার।
দৃষ্টিহীন হলেও ওজন পরিমাপ বা কেনাবেচায় হাসিদুলের দক্ষতা প্রশংসনীয়। হাতের স্পর্শেই তিনি নিখুঁতভাবে বুঝে নেন মালামালের ওজন ও টাকার নোটের মূল্যমান। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে আঙুলের ছোঁয়ায় নোট চেনার এই অলৌকিক ক্ষমতা ও সততার কারণে স্থানীয়দের কাছে তিনি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এক মুখ।
হাউজিং সি-ব্লকের বাসিন্দা নাঈম খান বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই হাসিদুল মামাকে দেখে আসছি। আমরা বাড়ির সব পুরোনো জিনিসপত্র তার কাছেই বিক্রি করি। অন্ধ মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনো কারও কাছে হাত পাতেন না।’ আরেক বাসিন্দা নাব্বির আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাবা-ছেলের এই সংগ্রাম দেখলে কষ্ট হয়। সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের উচিত ছেলেটির পড়ালেখা ও পরিবারের স্থায়ী কর্মসংস্থানের দায়িত্ব নেওয়া।’
বাবাকে পথ দেখাতে গিয়ে জিমের নিজের শৈশব ও শিক্ষার স্বপ্ন থমকে গেছে তৃতীয় শ্রেণিতেই। পড়ালেখা করে বড় কিছু হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বাবার একা চলার অক্ষমতা তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশু জিম বলে, ‘বাবা দেখতে পান না, আমি না থাকলে চলবেন কীভাবে? আমার পড়ালেখা করতে খুব মন চায়, কিন্তু বাবাকে সাহায্য করতে গিয়ে আর স্কুলে যাওয়া হয় না।’
প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড থাকলেও স্বাবলম্বী হওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার হাসিদুলের। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘চোখে দেখি না ঠিকই, কিন্তু হাত-পা তো ভালো আছে। কাজ করতে পারি, তাই ভিক্ষা করতে যাব কেন? নিজের শ্রমে খাই, আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো আছি। কারও কাছে কিছু চাওয়ার নেই।’
এ বিষয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘মানুষ মানুষের জন্য’ (কুষ্টিয়া)-র সভাপতি শাহাবউদ্দিন মিলন বলেন, হাসিদুলের মতো আত্মমর্যাদাবান মানুষের পাশে দাঁড়ানো সামাজিক দায়িত্ব। বিশেষ করে তার ছেলে জিমের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কুষ্টিয়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল লতিফ জানান, হাসিদুলের মতো কর্মক্ষম প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে স্বাবলম্বী করতে সরকারের বিভিন্ন পুনর্বাসন প্রকল্প রয়েছে। আমরা দ্রুত তার খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও জিমের শিক্ষার বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করব।



