লোডশেডিংয়ে ধুঁকছে সৈয়দপুর শিল্পনগরী

বিদ্যুৎ সংকটে দেশজুড়ে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চরম প্রভাব পড়েছে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বন্ধ থাকছে মেশিন, কমছে উৎপাদন। একই সঙ্গে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বাড়ছে ব্যবসায়িক চাপ। বিদ্যুৎনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কর্মঘণ্টা কমে আয় হারিয়েছেন শ্রমিকরাও।
নীলফামারীর সৈয়দপুরে গত দুই সপ্তাহের তীব্র লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছেন শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনে-রাতে গড়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির কারণে অনেক কারখানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন কমেছে, অন্যদিকে বাড়ছে বিকল্প জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয়। তবে নেসকো জানিয়েছে, গত দুই দিন ধরে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং চাহিদার কাছাকাছি বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।
এ সংকটের প্রভাব পড়েছে সৈয়দপুরের বিসিক শিল্পনগরীসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, ক্ষুদ্র গার্মেন্টস, বেকারি, জুতা তৈরি, পাটজাত পণ্য, ওয়ার্কশপ, প্রিন্টিং প্রেস, পলিথিন রিসাইক্লিং ও অটো রাইস মিলসহ নানা প্রতিষ্ঠানে।
নোয়াহ্ রয়েল রিল্যাক্স মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজু পোদ্দার বলেন, এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে শুধু এক ঘণ্টার উৎপাদন বন্ধ হয় না। মেশিন চালু করা, শ্রমিকদের কাজে ফেরানো এবং উৎপাদনের ধারাবাহিকতা আনতে বাড়তি সময় লাগে। ফলে প্রতিদিন আমাদের লোকসান গুণতে হচ্ছে।
এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে শ্রমিকের ওপর। মঈন নামে এক ওয়ার্কশপ শ্রমিক বলেন, বিদ্যুৎ থাকলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে যে আয় হয়, বিদ্যুৎ না থাকলে তা হয় না। অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা বসে থেকে কাজ না করেই বাড়ি ফিরতে হয়।
শ্রমিক ময়নুল ইসলাম বলেন, আমরা কাজ করলে টাকা পাই। বিদ্যুৎ না থাকলে কাজ বন্ধ থাকে। তখন মালিকও মজুরি দিতে পারেন না, আমাদেরও সংসার চালাতে কষ্ট হয়।
লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি হয়েছে সময়নির্ভর ব্যবসাগুলোতে। বিশেষ করে প্রিন্টিং প্রেস, বেকারি, ওয়ার্কশপসহ যেসব প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে হয়, সেগুলো চরম বিপাকে পড়েছে।
প্রিন্টিং ব্যবসায়ী মো. আমজাদ আলী বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ৮-১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকত না। গ্রাহক সময়মতো কাজ চান। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকলে মেশিন চালানো যায় না। ফলে সময়মতো ডেলিভারি দিতে না পেরে ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সৈয়দপুর শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বলেন, একটি মেশিন চলার উপযোগী করতে অনেক সময় এক থেকে দেড় ঘণ্টা লাগে। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদনের পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় না। এতে দৈনিক উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
শিল্প উদ্যোক্তারা জানান, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত থাকলে উৎপাদন খরচ যেমন বাড়বে, তেমনই পণ্যের দামও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সময়মতো অর্ডার সরবরাহ না করতে পেরে বাজার হারানোর আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরীর উপ-ব্যবস্থাপক মো. নুরেল হক বলেন, এখানে প্রায় ৫০টি কলকারখানা রয়েছে, যা পুরোপুরি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। শিল্প এলাকা হওয়ায় অন্য জায়গার তুলনায় লোডশেডিং কিছুটা কম। তারপরও সরবরাহে ঘাটতি থাকায় স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণ হিসেবে জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন ঘাটতির কথা জানিয়েছে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো)। নেসকো সৈয়দপুরের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আলিমুল ইসলাম সেলিম বলেন, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতির কারণে কিছু এলাকায় লোডশেডিং করতে হয়েছে। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য আনতে সূচি অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিতরণের চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে সৈয়দপুরে প্রতিদিন ৩৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ২৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন সাড়ে ১২ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল। তবে দুদিন ধরে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে।
আলিমুল ইসলাম আরও বলেন, গত দুদিন আমরা প্রায় ৩১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছি, যা চাহিদার প্রায় কাছাকাছি। ফলে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। শিল্প এলাকায় উৎপাদন অব্যাহত রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।




