তেঁতুলিয়ার ভয়াবহ ভাঙন/‘এই রাতটা কীভাবে কাটাব জানি না’

‘এই রাতটা কীভাবে কাটাব জানি না। কখন যে ঘরটাও নদীতে চলে যায়, সেই ভয়েই আছি। আমাদের স্বজনদের কবরও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন আমরা কোথায় থাকব, সেটাই বুঝতে পারছি না’— কথাগুলো বলছিলেন পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার হাজিরহাট এলাকার গৃহবধূ খাদিজাতুল সুখী।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার পর তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র স্রোতে হঠাৎ ভয়াবহ ভাঙন শুরু হলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়।
প্রবল স্রোতের টানে হাজিরহাট জামে মসজিদের পশ্চিম-উত্তর পাশের নদীতীরের প্রায় ২০টি কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ভাঙনের কবলে পড়েছে নদীতীর রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেলা জিওব্যাগ, সংলগ্ন পাকা সড়ক ও আশপাশের বসতভিটা। স্বজনদের কবর হারানোর শোকের সঙ্গে এখন নিজেদের ঘরবাড়ি হারানোর আশঙ্কা—এই দুই দুশ্চিন্তায় রাত কাটছে নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের।
স্থানীয়রা জানান, কয়েক দিন ধরে তেঁতুলিয়া নদীতে পানির চাপ ও স্রোত বাড়ছিল। এর ফলে হাজিরহাট লঞ্চঘাট ও মসজিদসংলগ্ন নদীর পাড়ে ধস শুরু হয়। তবে মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর হঠাৎ ভাঙনের তীব্রতা অনেক বেড়ে যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর তীর রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেলা শতাধিক জিওব্যাগের বেশ কিছু অংশ তীব্র স্রোতে ধসে নদীতে চলে গেছে। পাশাপাশি সংলগ্ন পাকা সড়কের কার্পেটিং ও মাটির অংশও ভেঙে নদীগর্ভে পড়ছে। ভাঙন অব্যাহত থাকায় সড়কের আরও অংশ নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে হাজিরহাট জামে মসজিদ, বাজার ও আশপাশের বসতবাড়ি চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
গৃহবধূ খাদিজাতুল সুখী বলেন, এই ভাঙনের পর আমাদের থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। স্বজনদের কবর নদীতে চলে গেছে। রাতের মধ্যে ঘরবাড়িও ভেঙে যেতে পারে। জানি না এই রাতটা কীভাবে কাটাব। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যেকোনো সময় মসজিদ ও হাজিরহাট বাজারসহ আশপাশের এলাকা নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। পাকা সড়কের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তেঁতুলিয়া নদীর জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়তে পারে। এতে নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার বিপুলসংখ্যক পরিবার পানিবন্দি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
ভয়াবহ ভাঙনের খবর পেয়ে মঙ্গলবার রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান মৃধা এবং দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম।
দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে ভাঙনের ভয়াবহতা দেখেছি। নদীর স্রোত অত্যন্ত তীব্র। এভাবে স্রোত অব্যাহত থাকলে রাতের মধ্যেই সড়কের আরও অংশ ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে ভাঙন প্রতিরোধে কাজ শুরু করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। নদীতীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার কয়েকটি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। প্রয়োজন হলে তাদের ইউনিয়ন পরিষদের সাইক্লোন সেন্টারে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

