logo

বগুড়া সিটি করপোরেশনের যাত্রা: উন্নয়নের সম্ভাবনা, আছে বড় চ্যালেঞ্জও

বগুড়া সিটি করপোরেশনের যাত্রা: উন্নয়নের সম্ভাবনা, আছে বড় চ্যালেঞ্জও

উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর বগুড়া অবশেষে সিটি করপোরেশনের মর্যাদা পেল। সোমবার (২০ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১টায় পৌর ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে বগুড়া সিটি করপোরেশনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এর মাধ্যমে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো পৌরসভাটি এখন দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশন হিসেবে নতুন প্রশাসনিক কাঠামোয় যুক্ত হলো।

১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বগুড়া পৌরসভা ধাপে ধাপে বিস্তৃত হয়ে ২০০৬ সালে ৪৮টি মৌজা যুক্ত করে প্রায় ৬৯ দশমিক ৫৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় সম্প্রসারিত হয়। ওয়ার্ড সংখ্যা ১২ থেকে বেড়ে ২১-এ উন্নীত হলেও দীর্ঘদিন ধরেই এটিকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তরের দাবি জানিয়ে আসছিল স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন।

নতুন মর্যাদা পাওয়ার পর বগুড়াবাসীর মধ্যে এখন উন্নত নাগরিক সেবা, পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক অবকাঠামো গড়ে ওঠার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে বর্ধিত এলাকার বড় অংশ এখনও নানা সংকটে রয়েছে। অনেক এলাকায় কাঁচা সড়ক, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং সড়কবাতির অভাবে সন্ধ্যার পর বিস্তীর্ণ অঞ্চল অন্ধকারে ডুবে থাকে। বর্ষায় জলাবদ্ধতা ও কাদায় চলাচলও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

২১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবদুল মালেক বলেন, কর দিচ্ছি নিয়মিত, কিন্তু রাস্তাঘাটের কোনো উন্নতি হয়নি। বৃষ্টির সময় ঘর থেকে বের হওয়াই কষ্টকর। 

একই এলাকার বাসিন্দা শিউলি বেগম বলেন, শহরের মতো কর দিই, কিন্তু অনেক জায়গায় এখনো গ্রামের মতো অবস্থা। এখন যদি সত্যিই সিটি করপোরেশন হিসেবে উন্নয়ন হয়, সেটাই আমাদের আশা।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, সিটি করপোরেশন হওয়ায় বগুড়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপন, আবাসন খাতের সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে। 

ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, বগুড়া উত্তরবঙ্গের বড় বাণিজ্যকেন্দ্র। পরিকল্পিত উন্নয়ন হলে বিনিয়োগও বাড়বে, কর্মসংস্থানও তৈরি হবে। তবে আগে যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি।

সিটি করপোরেশন ঘোষণার মাধ্যমে নগর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এখন থেকে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি পরিকল্পিত সড়ক নেটওয়ার্ক, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, স্ট্রিট লাইটিং এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে নতুন অবকাঠামো গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রশাসনিক মর্যাদা পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়। কার্যকর পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়ন ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। বিশেষ করে বর্ধিত এলাকার অবকাঠামোগত দুর্বলতা দুর করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যানজট, জলাবদ্ধতা, ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থা, বাস টার্মিনালের সংকট এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা দীর্ঘদিন ধরেই নাগরিক ভোগান্তির কারণ হয়ে আছে।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিটি করপোরেশন হওয়ার পর এখন বড় পরিসরে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সিটি করপোরেশন হিসেবে নতুন যাত্রা বগুড়ার জন্য একটি বড় সুযোগ। তবে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে না পারলে প্রশাসনিক পরিবর্তনের সুফল সাধারণ মানুষ খুব বেশি পাবে না। তাই এখন নজর থাকবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের গতির দিকে।

বগুড়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কালাম আজাদ বলেন, সিটি করপোরেশন হওয়া নিঃসন্দেহে বগুড়ার জন্য একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি। তবে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন হবে।

বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বগুড়া জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন বলেন, বগুড়া সিটি করপোরেশন হওয়ায় এখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়েছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই শহরকে আধুনিক, পরিকল্পিত এবং বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তোলা। দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন হবে।