logo

দেশজুড়ে বাড়ছে নাটোরের রেণু পোনার চাহিদা

বাপ্পী লাহিড়ী
নাটোর
দেশজুড়ে বাড়ছে নাটোরের রেণু পোনার চাহিদা
হ্যাচারিতে মাছ থেকে ডিম সংগ্রহ করা হচ্ছে। ছবি। এশিয়া পোস্ট

মৎস্য উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে নাটোরের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। এখানে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত বেশ কিছু হ্যাচারিও রয়েছে। এসব হ্যাচারিতে উৎপাদিত রেণু পোনা মানসম্মত হওয়ায় সারা দেশে এর চাহিদা বাড়ছে। এসব রেণু পোনার মড়কের হারও যথেষ্ট কম। ফলে এখানকার রেণু পোনা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে এবং দেশের মৎস্যচাষ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের মতে, মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ নাটোর জেলায় বিপুলসংখ্যক নদ-নদীর পাশাপাশি রয়েছে ছোট-বড় পুকুর। এ জেলার বড় মাছ উৎপাদনে খ্যাতি রয়েছে। এখান থেকেই উদ্বৃত্ত মাছ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত হয়ে থাকে। ঠিক তেমনিভাবে এখানে মাছের রেণু উৎপাদনেরও একটি ঐতিহ্য রয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় নাটোর সদর, কারবালা ও বড়াইগ্রাম মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে মাছের রেণু উৎপাদিত হয় এবং মৎস্যচাষীদের রেণুর চাহিদা পূরণ করা হয়।

মাছের রেণু উৎপাদনকারী ও ক্রেতারা জানান, নাটোরের হ্যাচারিগুলোতে উৎপাদিত মাছের রেণু পোনা দ্রুত বর্ধনশীল ও রোগমুক্ত। অন্যান্য জায়গার তুলনায় এখানকার রেণু পোনার মড়কের হারও কম। তাই এখানকার রেণু পোনার যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। এসব রেণু পোনা সংগ্রহ করে পুকুরে মাছ চাষ করলে তা যেমন দ্রুত বৃদ্ধি পায়, তেমনি উৎপাদনও বেশি হয়। ফলে মৎস্যচাষীরা লাভবান হন। এতে নাটোরের মাছের রেণু পোনা দেশের মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব খামারে কর্মসংস্থান হওয়ায় বেশ কিছু শ্রমিক হ্যাচারিতে কাজ করে তাদের সংসার পরিচালনা করছেন।

মাছের রেণু কিনতে আসা আল মামুন, আনোয়ার হোসেন, রাসেল আহমেদ, মৎস্যচাষী ইউসুফ আলী, রেণুচাষী আবু রায়হান ও আনসার আলী জানান, নাটোরের হ্যাচারির মাছের রেণুর গুণগত মান অনেক ভালো। অন্যান্য জায়গার মাছের তুলনায় এখানকার রেণু পোনার মড়কের হার অনেক কম। পুকুরে চাষ করলে এখানকার মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে তাদের মতো ক্ষুদ্র মৎস্যচাষীদের লাভ বেশি হয়।

তারা জানান, এক কেজি রেণু পোনার দাম ৬ হাজার টাকা। এক বিঘা পুকুরে আধা কেজি রেণু পোনা ছাড়া হলে দেড় মাসের মধ্যে এক থেকে দেড় লাখ টাকা আয় করা সম্ভব হয়। নাটোরে উন্নত জাতের মাছের রেণু পাওয়া যায়। এসব মাছ অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং মড়কের হারও অনেক কম। ফলে এখান থেকে রেণু পোনা নিয়ে গিয়ে ক্ষুদ্র মৎস্যচাষীরা লাভবান হন।

তোফায়েল নামে মৎস্যচাষী জানান, তিনি ২২ বিঘা পুকুরে মাছ চাষ করেন। তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে মাছের রেণু ও পোনা সংগ্রহ করেন। এ বছর তিনি নাটোর থেকে মাছের রেণু পোনা সংগ্রহ করেছেন। নাটোরের রেণু পোনা থেকে উৎপাদিত মাছের গ্রোথ অনেক বেশি হয়েছে এবং উৎপাদনও অনেক বেশি হয়েছে।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

রেণুচাষীরা জানান, পুকুরে নিজেরাই মাছ তৈরি করেন। এরপর সেই মাছ জেলে দিয়ে ধরে হ্যাচারিতে আনেন। তারপর সেখানে ডিম উৎপাদন করে বোতলে নেওয়া হয়। সেখানে ডিম ফুটিয়ে রেণু তৈরি করেন। সেখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করেন। এখানকার রেণু পোনার চাহিদা ও সুনাম থাকায় মানুষ এখান থেকে রেণু পোনা কিনে নিয়ে যায় এবং লাভবান হয়। আল্লাহর রহমতে তাদের ভালো চলছে।

বিসমিল্লা মৎস্য হ্যাচারির শ্রমিক হাবিল জানান, এই হ্যাচারিতে তারা পাঁচজন শ্রমিক কাজ করেন। তারা হ্যাচারির দেখভাল করেন। এখান থেকে তারা যে মজুরি পান, তা দিয়ে তাদের সংসার ভালোভাবে চলে। এরকম আরও হ্যাচারি থাকলে তাদের মতো আরও লোকের কর্মসংস্থান হবে এবং মানুষ ভালো মাছের উৎপাদন পাবে।

নাটোর সদর সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের ব্যবস্থাপক জয়নুল আবেদীন এবং বড়াইগ্রাম উপজেলার কারবালা সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের ব্যবস্থাপক নির্মল কুমার কুন্ডু জানান, তারা সরকারি খামারে ধানি ও মূল মাছ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবার দিয়ে তৈরি করেন। এসব মাছকে চালের খুদ, কুড়া, সরিষার খৈল, চিটাগুড়, ভুট্টার কুড়া খাওয়ানো হয়। সারা বছর পরিচর্যার পর যখন এসব মাছ বর্ষার সময় ডিম দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে, তখন মা মাছগুলোকে আলাদা পুকুরে স্থানান্তর করে লালন-পালন করা হয়।

এরপর মা মাছগুলোকে উন্নতমানের কিছু প্রোটিন, ভিটামিন ও প্রাকৃতিক শৈবাল খাওয়ানো হয়, যাতে তারা দ্রুত সক্ষমতা অর্জন করে। এতে মাছগুলো দ্রুত বর্ধনশীল ও রোগমুক্ত হয়। এসব মাছ থেকে যে বড় মাছ তৈরি হয়, তার স্বাদ খুব ভালো এবং তা দ্রুত বর্ধনশীল। যেহেতু এসব মাছ রোগমুক্ত ও দ্রুত বর্ধনশীল এবং অন্যান্য জায়গার চেয়ে ভালো, তাই মৎস্যচাষীরা এই পোনা সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়ে উপকৃত ও লাভবান হচ্ছেন।

তারা আরও জানান, সরকারি হ্যাচারিগুলোতে নিজেদের মাছ সংগ্রহ করে উন্নতমানের রেণু উৎপাদন করা হয় এবং তা মৎস্যচাষীদের সরবরাহ করা হয়, যাতে দেশের মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ওমর আলী জানান, নাটোর মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ একটি জেলা। এ জেলা বড় মাছ উৎপাদনে খ্যাতি রয়েছে। এখান থেকেই উদ্বৃত্ত মাছ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত হয়ে থাকে। ঠিক তেমনিভাবে এখানে মৎস্য রেণু উৎপাদনেরও একটি ঐতিহ্য রয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় নাটোর সদর, কারবালা ও বড়াইগ্রাম মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে মাছের রেণু উৎপাদিত হয় এবং মৎস্যচাষীদের রেণুর চাহিদা পূরণ করা হয়।

তিনি বলেন, এলাকার চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী বিভাগের রংপুর, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এই রেণু পোনা চলে যায়। এই এলাকার মৎস্যচাষী এবং রেণু পোনা চাষীরা উদ্বৃত্ত মাছের রেণু উৎপাদন করে নিজেদের স্বাবলম্বী করছেন। তাদের হ্যাচারির লাইসেন্স প্রদান করে তা পরিদর্শন করা হয়, যাতে তারা মানসম্মত রেণু পোনা উৎপাদন করেন। তাদের সবসময় সহযোগিতা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।