logo
Advertisement

তিনটি দিয়ে শুরু করা পাঠাগারটির সংগ্রহে এখন ১৫ হাজার বই

মাজহারুল করিম অভি,ব্রাহ্মণবাড়িয়া
তিনটি দিয়ে শুরু করা পাঠাগারটির সংগ্রহে এখন ১৫ হাজার বই
পাঠাগারে অধ্যয়ন করছেন কয়েকজন তরুণ-তরণী। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার সুহাতা গ্রামের ‘গুঞ্জন পাঠাগার’। ছবি: এশিয়া পোস্ট

প্রত্যন্ত গ্রামের একটি ছোট্ট টিনের ঘর। সেখানে ছিল মাত্র তিনটি বই। সেই তিন বইকে সঙ্গী করেই শুরু হয়েছিল বই পাগল স্বপনের স্বপ্নের যাত্রা। সময়ের সঙ্গে সেই স্বপ্ন এখন রূপ নিয়েছে জ্ঞানের এক বিশাল ভাণ্ডারে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার সুহাতা গ্রামের ‘গুঞ্জন পাঠাগার’ এখন শুধু বই পড়ার স্থান নয়, বরং এলাকার শিশু-কিশোর ও তরুণদের জ্ঞানচর্চা, স্বপ্ন আর আত্মগঠনের এক অনন্য ঠিকানা।

Advertisement

২০০৪ সালের ৩০ মার্চ ‘এসো বই পড়ি, আলোকিত সমাজ গড়ি’ স্লোগানে মাত্র তিনটি বই নিয়ে গুঞ্জন পাঠাগারের যাত্রা শুরু করেন স্বপন মিয়া। সরকারি তালিকায় পাঠাগারটির প্রতিষ্ঠাবর্ষ ২০০৪ এবং নিবন্ধন নম্বর জেসগগ্র/ব্রাহ্মণ/২০১৭/০০৩ উল্লেখ রয়েছে।

তবে গুঞ্জনের গল্প কেবল একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রতিষ্ঠাতা স্বপন মিয়ার দীর্ঘ সংগ্রাম, অভাবের সঙ্গে লড়াই এবং বইকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার এক অসাধারণ জীবনযুদ্ধ।

সুহাতা গ্রামের হারুন মিয়ার ছেলে স্বপন মিয়া। মাত্র দেড় বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। সংসারের তিন সন্তানকে মানুষ করতে তার মা রাজিয়া খাতুনকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। অভাবের সংসারে বড় হওয়া স্বপনের কাছে বইয়ের প্রতি ভালোবাসাই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি।

গ্রামের শিশু-কিশোরদের বই পড়ার সুযোগ তৈরি করার স্বপ্ন থেকে তিনি পাঠাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। স্বপ্নপূরণে তাঁর মা পাশে দাঁড়ান। বসতভিটার সোয়া দুই শতাংশ জায়গা পাঠাগারের জন্য দেন এবং একটি এনজিও থেকে ৮ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু হয় ছোট্ট টিনের ঘরে গুঞ্জন পাঠাগারের পথচলা।

পাঠাগারে অধ্যয়ন করছে শিশুরা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার সুহাতা গ্রামের ‘গুঞ্জন পাঠাগার’। ছবি: এশিয়া পোস্ট
পাঠাগারে অধ্যয়ন করছে শিশুরা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার সুহাতা গ্রামের ‘গুঞ্জন পাঠাগার’। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পাঠাগার টিকিয়ে রাখার পথ সহজ ছিল না। কখনও দিনমজুরি, কখনও রিকশা চালানো, আবার কখনও পথে পথে পান-সিগারেটসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে আয় করেছেন স্বপন মিয়া। সীমিত আয়ের মধ্যেও বই সংগ্রহ ও পাঠাগার পরিচালনার কাজ বন্ধ হতে দেননি স্বপন।

স্বপন জানান, দীর্ঘ ২২ বছরের পথচলায় গুঞ্জন পাঠাগারের চেহারাও বদলেছে। একসময় যে পাঠাগারের সংগ্রহে ছিল মাত্র তিনটি বই, এখন সেখানে প্রায় ১৫ হাজার বই রয়েছে। সেই একচালা টিনের ঘর আজ রূপ নিয়েছে দোতলা ভবনে।

অভাব ও সংগ্রামের মধ্যেও নিজের শিক্ষাজীবন থামতে দেননি স্বপন মিয়া। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

বর্তমানে তিনি কসবার বায়েক শাহ আলম কলেজে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। চাকরি থেকে পাওয়া আয়ের বড় একটি অংশও তিনি পাঠাগারের পেছনে ব্যয় করেন।

পাঠাগারে অধ্যয়নে অংশ নেওয়া শিশু-কিশোররা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার সুহাতা গ্রামের ‘গুঞ্জন পাঠাগার’। ছবি: এশিয়া পোস্ট
পাঠাগারে অধ্যয়নে অংশ নেওয়া শিশু-কিশোররা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার সুহাতা গ্রামের ‘গুঞ্জন পাঠাগার’। ছবি: এশিয়া পোস্ট

গুঞ্জন পাঠাগারকে কেন্দ্র করে নিয়মিত পাঠচক্র, সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা, বই পড়ার আয়োজনসহ নানা শিক্ষামূলক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি শুক্রবার পাঠাগারটিতে শিশু-কিশোর ও বইপ্রেমীদের উপস্থিতি বাড়ে।

বই পড়ার প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়াতে পাঠাগার কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় ব্যতিক্রমী আয়োজনও করেছে। ২০২৪ সালে পাঠাগারের বাইরে ভোলাচং উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বই পড়ার আয়োজন করা হলে শতাধিক পাঠক এতে অংশ নেন।

সাম্প্রতিক সময়েও গুঞ্জন পাঠাগারকে ঘিরে শিক্ষা সফর ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত আগস্টে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অদ্বৈত মল্লবর্মণ স্মৃতি পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্রের সদস্যরা এখানে শিক্ষা সফরে আসেন।

স্থানীয়দের কাছে গুঞ্জন পাঠাগার শুধু একটি ভবন বা বইয়ের সংগ্রহ নয়। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এটি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণার জায়গা।

বই হাতে ‘গুঞ্জন পাঠাগারের’ প্রতিষ্ঠাতা স্বপন মিয়া। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বই হাতে ‘গুঞ্জন পাঠাগারের’ প্রতিষ্ঠাতা স্বপন মিয়া। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পাঠাগারের সঙ্গে যুক্ত অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন, কেউ বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলে ভর্তি হয়েছেন, আবার কেউ কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন বলে স্বপন মিয়া জানিয়েছেন। পাঠাগারটির মাধ্যমে একটি প্রত্যন্ত গ্রামের নতুন প্রজন্মের মধ্যে বই পড়া ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

স্বপন মিয়ার ভাষায়, অর্থের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী বই কিনতে পারে না বা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সমস্যায় পড়ে। সেই বাস্তবতা থেকেই গুঞ্জন পাঠাগারের জন্ম। তাঁর স্বপ্ন, ব্যক্তি স্বপন মিয়া একদিন না থাকলেও পাঠাগারটি যেন এলাকার মানুষের জন্য জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যেতে পারে।

মাত্র তিনটি বই দিয়ে শুরু হওয়া সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ ২২ বছরের পথ পেরিয়ে একটি জনপদের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। গুঞ্জন পাঠাগারের গল্প তাই শুধু বইয়ের গল্প নয় এটি এক মানুষের স্বপ্ন, এক মায়ের ত্যাগ এবং জ্ঞানের আলোয় একটি প্রজন্মকে এগিয়ে নেওয়ার গল্প।