logo

লাল শাড়িতে যাওয়া মিতু বাড়ি ফিরলেন সাদা কাফনে

লাল শাড়িতে যাওয়া মিতু বাড়ি ফিরলেন সাদা কাফনে

গতকাল যে বাড়ির সবাই ছিল বিয়ের আনন্দে আত্মহারা, আজ সেই বাড়িজুড়ে শুধু কান্নার শব্দ। লাল শাড়ি আর মেহেদী রাঙ্গা হাতে যাচ্ছিলেন শ্বশুরবাড়ি। কনেকে বরণ করতেও প্রস্তুত ছিল শ্বশুরবাড়ির লোকজন। তার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিভে গেছে ১৪টি প্রাণ। 

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বাগেরহাটের রামপালে সড়ক দুর্ঘটনায় খুলনার কয়রা উপজেলার নববধূ মিতুসহ তার পরিবারের তিনজন নিহত হন। নিহতরা হলেন উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের ছালাম মোড়লের মেয়ে নববধূ মার্জিয়া আক্তার মিতু (১৮), তার ছোট বোন লামিয়া (১১) এবং মিতুর দাদি রাশিদা বেগম (৭৫)। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার (১৩ মার্চ) ভোর সাড়ে ৪টায় নববধূসহ তিনজনের লাশ পৌঁছায় তাদের বাড়িতে। লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকে পাগলপ্রায় মিতুর বাবা-মা ও স্বজনরা। কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। 

আজ শুক্রবার সকাল ১০ টায় উত্তর নাকশা গ্রামেই তাদের জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন সেখানে উপস্থিত হন। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। গত বুধবার রাতে উপজেলার নাকসা গ্রামের সালাম মোড়লের মেয়ে মিতুর বিয়ে হয় রামপাল এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে সাব্বির হোসেনের সঙ্গে। বৃহস্পতিবার সকালে নববধূ মিতু তার ছোট বোন লামিয়া ও বৃদ্ধা দাদি রাশিদা বেগমকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। পথে বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটি রামপাল বেলাই ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে মংলা থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসে থাকা নববধূ, বর ও তাদের স্বজনসহ ১৪ জন নিহত হন। 

শুক্রবার সকালে নিহত নববধূ মিতুর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বাবা আ. ছালাম বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। তিনি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছেন আর বলছেন, ‘আমার মায়েরা কোথায়। আমি একটু তাদের দেখব।’ তার কান্নায় উপস্থিত সকলের চোখে পানি এসে যায়। তার দুই মেয়ে আর নিজের মায়ের মুত্যুকে মেনে নিতে পারছে না তিনি। 
সালামের বাবা আগেই মারা গেছেন। বেঁচে ছিলেন তার মা। দুই কন্যা আর শিশুপুত্র ইসমাইলকে নিয়ে ছিল তার সব স্বপ্ন। ওই বিয়ের গাড়িতে পুত্র ইসমাইল জোর করে উঠলেও জায়গা না থাকায় তাকে নামিয়ে নেওয়া হয়ছিল। তার আবদার মেটাতে সকালেই নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তার আর বরের বাড়ি যাওয়া হল না। 

মিতুর মা মুন্নি খাতুনের অবস্থা খুবই খারাপ। দুই মেয়ে আর শাশুড়ির লাশ বাড়িতে আনার সঙ্গেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। মাঝে মধ্যে চোখ দুটি একটু খোলার চেষ্টা করেন। তবে কিছু বলতে পারছেন না। এই দুর্ঘটনায় মুন্নির মাও নিহত হয়েছেন। তাকে দাকোপ উপজেলার পানখালী গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

মিতুর চাচা মোফেজ মোড়ল বলেন, তার পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা নেই। এতবড় শোক কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। 

নাকশা ডিএফ আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আশরাফুল ইসলাম বলেন, নিহত নববধূ মিতু তার মাদ্রাসার আলিম শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাকে হারিয়ে শিক্ষকরাও শোকস্তব্ধ।

আমাদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জুয়েল বলেন, আগে এমন ঘটনা তার ইউনিয়নে আর কখনও ঘটেনি। পুরো ইউনিয়নের মানুষ শোকে স্তব্ধ। নিহতদের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। 

কয়রা থানার ওসি (তদন্ত) মো. শাহ আলম বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে নাকশা গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে নিহতদের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।