Advertisement

তিন নদীর ২৩ পয়েন্টে ভাঙন, বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি

এশিয়া পোস্ট নিউজ, চট্টগ্রাম
তিন নদীর ২৩ পয়েন্টে ভাঙন, বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি
ভেঙে যাচ্ছে একের পর এক জমি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

‘প্রতিবারই উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ফুলে-ফেঁপে ওঠে নদী। পানি নামতে না নামতেই শুরু হয় নির্মম ভাঙন। এভাবে প্রতি বর্ষায় নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বাপ-দাদার শ্মশান, হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের স্মৃতির শেষ আশ্রয়টুকুও।’ কথাগুলো বলতে বলতে সর্তা নদীর দিকে তাকাচ্ছিলেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির খিরাম ইউনিয়নের মধ্যখিরাম এলাকার বাসিন্দা মন্টু নাথ (৫৫)। তার চোখের সামনে নদী শুধু মাটিক্ষয় করছে না, যেন গিলে খাচ্ছে পূর্বপুরুষদের শেকড় ও স্মৃতি।

মন্টু নাথের এই আকুতি কেবল তার একার নয়; হালদা, ধুরুং ও সর্তা নদীর তীরবর্তী শত শত পরিবারের জন্য এটি এক করুণ বাস্তবতা। প্রতি বর্ষায় পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পর শুরু হওয়া নদীভাঙনে ভিটেমাটি, কৃষিজমি, কবরস্থান, শ্মশান এবং গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা হারিয়ে গৃহহীন হচ্ছে বহু মানুষ।

সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ফটিকছড়িতে হালদা, ধুরুং ও সর্তা নদীর মোট ২৩টি পয়েন্টে নদীবেড়িবাঁধ ও নদীতীর ভেঙে গেছে। এতে নতুন করে ঝুঁকিতে পড়েছে কয়েক হাজার বসতবাড়ি।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের বন্যায় ফটিকছড়ির নদীগুলোর ২ হাজার ৪২০ মিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে হালদা নদীতে ১ হাজার ৯৫ মিটার, ধুরুং নদীতে ১ হাজার ২০৫ মিটার এবং সর্তা নদীতে ১২০ মিটার ভাঙন ধরেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব স্থান স্থায়ীভাবে মেরামতে প্রাথমিকভাবে ৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা প্রয়োজন বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, হালদা নদীর হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের পাটিয়ালছড়ি, নাজিরহাট পৌরসভার ফরহাদাবাদের চাঁদগাজী তালুকদার বাড়ি এবং নারায়ণহাট ইউনিয়নের উত্তর সুন্দরপুর এলাকায় তীব্র ভাঙন চলছে। অন্যদিকে ধুরুং নদীর পাইন্দং ইউনিয়নের বেড়াজালির খয়রাতি পাড়া, ফটিকছড়ি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড ও কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর এলাকায় নদীতীর ধসে পড়েছে।

এছাড়া সর্তা নদীর খিরাম ইউনিয়নের হচ্চারঘাটের পূর্ব পাশ, মধ্যখিরাম নুরনগরপাড়া, গোয়াজ মোহাম্মদ বাড়ির পূর্ব পাশ ও প্রাচীন সমাধিখোলা এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব এলাকায় ইতোমধ্যে প্রায় ১০ একর কৃষিজমি নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে।

ফরহাদাবাদ এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী (৭৫) বলেন, হালদা নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙেছে। পাউবো সাময়িক কিছু কাজ করলেও স্থায়ী কিছু হয় না। বর্ষা এলেই আতঙ্কে রাত কাটে। পাইন্দংয়ের বাসিন্দা দৌলত মিয়ার দাবি, জরুরি সংস্কারের বদলে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ না করলে নদীতীরবর্তী মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সোহাগ তালুকদার জানান, ২৩টি ক্ষতিগ্রস্ত পয়েন্টের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২৫০ মিটার এলাকায় জরুরি সংস্কারকাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাকি অংশ চলতি অর্থবছরের উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, নদীভাঙন পরিস্থিতি কঠোর নজরদারিতে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তালিকা জেলা প্রশাসন ও পাউবোতে পাঠানো হয়েছে। জানমাল রক্ষায় সমন্বিতভাবে কাজ চলছে।