logo

জনগণকে দেওয়া অঙ্গীকার লঙ্ঘন করেছে সরকার: জামায়াত আমির

জনগণকে দেওয়া অঙ্গীকার লঙ্ঘন করেছে সরকার: জামায়াত আমির

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকার জনগণকে দেওয়া অঙ্গীকার লঙ্ঘন করেছে। জনগণের অধিকার আদায়ে একচুলও ছাড় দেওয়া হবে না। সংসদের ভেতরে ও বাইরে প্রতিবাদ জারি রাখা হবে।

শনিবার (১১ এপ্রিল) বিকেলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নির্বাচনি সহিংসতায় আহত শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারিকে দেখার পর সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কালকে কি কারণে সংসদে ওয়াকআউট করেছি আপনারা দেখেছেন। এগুলো কি আমাদের দলীয় কোনো সাবজেক্ট? এটা জনগণের জীবনের সঙ্গে, জনগণের জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই যে পুলিশের সদস্যরা আছেন, তারাও তাদের নিজস্ব ডিপার্টমেন্টে সুবিচার পান না। সেগুলো নিয়েও কথা বলতে চেয়েছিলাম। আমাদের কথা বলতে দেওয়া হয়নি। আমরা এ কথা থামাব না। সংসদের ভেতরেও বলব, বাইরেও বলব। তবে সরকার তার দায়িত্ব পালনে ও জনগণকে দেওয়া তাদের যে ওয়াদা ছিল সেটা তারা লঙ্ঘন করেছে। অন্যায় করেছে, জনগণের ওপর জুলুম করেছে, জনগণকে অপমান করেছে। আমরা সেই অপমানের প্রতিশোধ হাল্লাচিল্লা, মারামারি করে নেব না। জনগণের অধিকার কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমেই আদায় করব।

তিনি বলেন, গত ৯ এপ্রিল দেশে দুটি উপনির্বাচন ছিল জাতীয় সংসদের। একটি শেরপুর, আরেকটি বগুড়া। এই দুই জায়গায় আমরা আশা করেছিলাম- বিগত নির্বাচন যেভাবেই হোক, এখন একটা সরকার হয়ে গেছে, আমরা কেউ বসেছি সরকারি দলে, কেউ বসেছি বিরোধী দলে। এখন সুন্দরভাবে দেশটা সামনের দিকে এগিয়ে যাক। কিন্তু এ দুটি নির্বাচনেও ব্যাপক অনিয়ম, বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি, সহিংসতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে শুধু সহিংসতা না, এটা ভয়াবহ সন্ত্রাসে রূপ নিয়েছে। এরকমই একটি বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছে শেরপুর-৩ আসনে।

তিনি বলেন, এর আগেও যখন ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল—তার আগেও এ ধরনের সহিংসতায় আমাদের একজন উপজেলা সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিমকে খুন করা হয়। তার সঙ্গে আরও তিনজন হামলার শিকার হয়ে আহত হন। তারা এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন। তারা এখনো আশঙ্কামুক্ত না। আবার এই জায়গায় যিনি আমাদের প্রার্থী ছিলেন—তিনি ভোটের আগেই মারা গেলেন। যার কারণে ভোট স্থগিত হয়ে যায়। এই স্থগিত নির্বাচনটাই ছিল ৯ এপ্রিল। এই নির্বাচনেও একজন মানুষ আগে মারা গেল, আবার একজন ৮০ বছরের কাছাকাছি বয়স্ক মানুষকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথায় কোপ দেওয়া হয়েছে। আঘাত একটাই, তবে গুরুতর। তিনি সংজ্ঞাহীন অবস্থায় প্রথমে ছিলেন, আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি, আজকে দেখলাম তিনি জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, এবার সংসদে প্রথমদিনই স্পিকার মহোদয়ের নির্বাচনের পরে প্রথমে সংসদ নেতা বক্তব্য দিয়েছেন, তারপরেই আমার সুযোগ ছিল। আমি সেখানে অনুরোধ করেছি, আসুন এই সংসদকে আমরা একটা উদাহরণ বানাই। অতীতে এই সংসদে দাঁড়িয়ে জনগণের কল্যাণের চাইতে পরস্পরের চরিত্র হননে সময় ব্যয় হয়েছে বেশি। কাদের টাকায় সংসদে বসি? জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ হয়। প্রতি মুহূর্তে প্রায় ৬০ লাখ টাকা সেখানে খরচ হয়। এটা কি মামুলি কথা?

জামায়াত আমির বলেন, এই পার্লামেন্টে যারা যাবেন, তারা যদি মানুষ খুন করে পার্লামেন্টে যান, তারা গিয়ে দেশবাসীর জন্য কি করবেন? মানুষের জীবন নিয়ে পার্লামেন্টে যেতে হবে কেন? যেতে হবে মানুষের জীবন, সম্পদ ও ইজ্জতের পাহারাদার হওয়ার জন্য। সেই লোকটার হাতেই যদি জীবন চলে যায়, ইজ্জতও চলে যায়, সম্পদও ধ্বংস হয়ে যায়—তাহলে তো এ ধরনের প্রতিনিধির যোগ্যতা রাখে না। আমরা এ জন্য আশা করব, আহ্বান জানাব- ভবিষ্যতে আরও বহু নির্বাচন হবে, সেই নির্বাচনে আর যেন সহিংসতা না হয়, আর যেন কোনো মায়ের বুক খালি না হয়, আর যেন কোনো বোন বিধবা না হয়, আর কোনো সন্তান যেন এতিম না হয়। আমরা চাই—আদর্শের লড়াই হোক। হাতের লড়াই নয়, অস্ত্রের লড়াই নয়।

সাংবাদিক বন্ধুদের জন্য বিশেষ একটা দোয়া করতে চাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনারা (সাংবাদিকরা) রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। আপনাদের দুটি চোখ, আপনাদের বিবেকের আরও দুটি চোখ। এই চারটি চোখ যতক্ষণ তাজা থাকবে, জাতি ততক্ষণ ঠিক পথের ওপর থাকবে। আর আপনাদের এই চারটি চোখ যদি কোনো কারণে এলোমেলো ব্যর্থ হয়ে যায়, বাকি তিন স্তম্ভ কাজ করবে না। ওই তিন স্তম্ভকে জাগিয়ে রাখার জন্যেই এই চতুর্থ স্তম্ভকে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতে হবে। তা যদি আপনারা করতে পারেন, সত্যিই আপনারা কলমযোদ্ধা, সত্যিই আপনারা বাগযোদ্ধা, আপনাদের যুদ্ধ, আপনাদের লড়াই মানুষের অধিকারের পক্ষে, সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে। কালোকে কালো, সাদাকে সাদা বলতে হবে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সম্পর্কে তিনি বলেন, এই হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা এক হাজার। কিন্তু আমাকে হাসপাতালের পরিচালক অবহিত করলেন, আজকেও হাসপাতালে ৩ হাজার ৭০০ রোগী ভর্তি অবস্থায় সেবা নিচ্ছে। আমি ইমারজেন্সি দিয়ে প্রবেশের সময় দেখলাম, অনেকেই মেঝেতে শুয়ে আছেন। এরপর দেখলাম—কারও পায়ে ব্যান্ডেজ, কারও হাতে ব্যান্ডেজ, আবার কারও মাথায় ব্যান্ডেজ। 

তিনি বলেন, যখন হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করেছি—দেখলাম, তিল ধারণের ঠাঁই নেই। হাসপাতালের বারান্দাগুলোর দুইপাশ মেঝেতে অসংখ্য রোগী শুয়ে আছে। চিকিৎসক ও নার্সদের কোনোরকমে চাপাচাপি করে হাঁটতে হয়। এটা প্রমাণ করে, আমরা আমাদের স্বাস্থ্যসেবায় জনগণের ওপরে সুবিচার করছি না। অথচ একটা সুস্থ-সবল জাতি গঠনের জন্য জনস্বাস্থ্যের সুস্থতার কোনো বিকল্প নেই। আর এটা কোনো সরকারের দয়া-দান নয়। এটা নাগরিকদের প্রতি সরকারের কর্তব্য। আর এটা পাওয়া নাগরিকদের অধিকার। আমরা সংসদে কথা বলছি, কথা আরও বলব। স্বচক্ষে হাসপাতালটি দেখে গেলাম।

সংসদে গণভোট গ্রহণ না করে বাতিল করা হয়েছে। আপনারা এটা নিয়ে আন্দোলনও করছেন, এটার ভবিষ্যৎটা কি? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে জামায়াতের আমির বলেন, মানুষ তো আশায় ভোট দিল। ইনশাল্লাহ মানুষের আশা পূরণ হবে। লড়াই আমাদের চলবে। আমরা থামব না। জীবন অনেক গিয়েছে, যাক। জাতির জন্য আরও দু-চারটা জীবন যাবে। আমারটা গেলেও আমি প্রস্তুত। কিন্তু মাঝখানে কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। জনগণের অধিকার নিয়ে টান দিলে আমরা চুল পরিমাণ ছাড় দেব না।

এ সময় জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।